রাজধানীতে ৮০ ভাগ আবাসিক হোটেলই অবৈধ, অনিরাপদ

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

ইমরান রহমান : রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোর মধ্যে ৮০ শতাংশের ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই। লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করছে বেশিরভাগ হোটেল। গোয়েন্দা তথ্য অনুসারে, ছোটো-বড় মিলিয়ে নগরীর ৯০০ হোটেলের মধ্যে হোটেল-ব্যবসার অনুমোদন রয়েছে মাত্র ১৭৮টির।

জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় এসে যাদের রাত্রিযাপন করতে হয়, তাদের বেশিরভাগকেই শরণাপন্ন হতে হয় কোনো না কোনো আবাসিক হোটেলে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির অভাব আর হোটেল কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে হোটেল রুমে খুন, অসামাজিক কার্যকলাপ, প্রতারণার মাধ্যমে নগ্ন ছবি ধারণ, চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা ও জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন রকম অপরাধ হরহামেশাই সংঘটিত হচ্ছে।

প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এভাবেই ব্যবসা চালাচ্ছেন অধিকাংশ আবাসিক হোটেল মালিক। অন্যদিকে আবাসিক হোটেল থেকে পুলিশের নিয়মিত চাঁদা নেয়ার অভিযোগও নতুন নয়। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নিজেদের রাত্রিযাপন কিংবা দেশের বাইরের অতিথিদের জন্য রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলো আসলে কতটুকু নিরাপদ?

হোটেলকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর আবাসিক হোটেল মালিকদের প্রতি বোর্ডার এন্ট্রি ফরমে বোর্ডারদের নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোবাইল ফোন নাম্বার লেখার এবং তা সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। একই নির্দেশনায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং বোর্ডারদের ছবি তুলে রাখার কথাও বলা হয়। অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য বোর্ডারের মোবাইল ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে তা সঠিক কিনা, তাও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে নেয়ার ব্যাপারে ডিএমপির নির্দেশনা রয়েছে।

সর্বশেষ, পূরণ করা তথ্য ফরমের ফটোকপি প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানোর নির্দেশ থাকলেও হোটেল মালিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কোনোটাই অনুসরণ করে না। ফলে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলেও পুলিশ সদস্যদের পক্ষে অপরাধী শনাক্ত করা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার কারো পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে সাধারণ বোর্ডারদের নিরাপত্তার বিষয়টিও রয়ে যায় ঝুঁকির মুখে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ আবাসিক হোটেল অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করছে। রাজধানী ঢাকাতে ছোট-বড় প্রায় ৯০০টি আবাসিক হোটেল আছে। যার মধ্যে অনুমোদন রয়েছে মাত্র ১৭৮টির। বড় কয়েকটি হোটেল ছাড়া মাঝারি ও ছোট হোটেলগুলোর নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে বেশিরভাগ হোটেলে যে কেউ যেকোনো সময় ঢুকে নাশকতা ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে আবাসিক হোটেল থেকে তিন শতাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল রাজধানীর

উত্তরায় নীলা আবাসিক হোটেল থেকে পুষ্পরানী নামে এক নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হোটেলে ওঠার আগে ওই নারী নিজের নাম পুষ্পা (৩০) ও সঙ্গে এক পুরুষের নাম দুর্জয় (৪০) ও এক শিশুকে সন্তান পরিচয় দিয়ে একটি রুম ভাড়া নেয়। কিন্তু পুলিশি তদন্তের বেড়িয়ে আসে ওই পরিচয় ছিল সম্পূর্ণই ভুয়া। তাদের সঙ্গে থাকা ওই শিশুটি তার নাতনি। নাম মনিষা। নাতনি মনিষাকে এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে বিক্রিতে বাধা দিতে গেলে ওই কথিত স্বামী লিটনের হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিনি। পরে ২৪ এপ্রিল ঘাতক লিটনকে কমলাপুরের একটি আবাসিক হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই হোটেলেও তিনি নাম-পরিচয় গোপন করে রুম ভাড়া নিয়েছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি রাতে তেজগাঁওয়ের পূর্ব তেজকুনিপাড়ার রয়েল গ্র্যান্ড আবাসিক হোটেল থেকে মীর হোসেন (৪৯) নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১৩ জানুয়ারি দুপুরে ফার্মগেট এলাকার ‘হোটেল ফার্মগেট’ থেকে শফিক আহমেদ চৌধুরী নামের এক ঠিকাদারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ১১ জানুয়ারি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে মেহেরান আবাসিক হোটেলের ১০৪ নম্বর কক্ষের তালা ভেঙে আবু বকর তালুকদার (৪৫) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিসুর রহমান জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মগবাজারের একটি এক আবাসিক হোটেল মালিক বলেন, বেশিরভাগ আবাসিক হোটেলেই সিসিটিভি ক্যামেরা ও বোর্ডারদের ছবি তুলে রাখার ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া নিয়মিত চাঁদা দিয়েই হোটেল ব্যবসা চালাতে হয়। তাই আর বাড়তি ঝামেলা করে লাভ কী।

রমনা মডেল থানার ওসি মশিউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, আমার থানা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০টি আবাসিক হোটেল আছে। সোনারগাঁও ও রাজমনি হোটেলের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে মাঝারি ধরনের যেগুলো আছে সেগুলোতে কিছু অব্যবস্থাপনা আছে। তবে আমরা হোটেল মালিকদের নিয়ে মিটিং করছি। নিয়মিত তাদের চিঠি দেয়া হচ্ছে। এতে সাড়া দিয়ে অনেক মালিকই সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। বোর্ডারদের তথ্য আমাদের দিচ্ছেন। আশা করা যায় অল্প সময়ের মধ্যে হোটেলগুলোর সমস্যাগুলো সমাধান করা যাবে।

পুলিশের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, হোটেলগুলোতে নানা রকম অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়। হোটেলে সিসিটিভি বসালে এসব খারাপ কাজের রেকর্ড থেকে যায়। তাই হোটেল মালিকরা বেশি টাকা খরচ করে অন্যভাবে ম্যানেজ করলেও সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা বোর্ডারদের ছবি তুলে রাখতে চান না।

হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আলমগীর সেলিম জানান, আবাসিক হোটেলেগুলোতে হত্যাকাণ্ডসহ নানা কারণে ঘটে। একটি অংশ নিজেদের শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য ভুল তথ্য দিয়ে হোটেলের কক্ষ ভাড়া করে। এক্ষেত্রেও তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বোর্ডার পরিচিত হওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্যই লিপিবদ্ধ করে না। পরে যেকোনো বিষয় নিয়ে নারী-পুরুষের দ্ব›েদ্বর জের ধরে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটে। দুষ্কৃতকারীদের আরেক অংশ মিথ্যা প্রেমের অভিনয় করে, বিয়ে-চাকরি ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে হোটেলে নিয়ে যায় তরুণীদের। পরে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার জন্য নির্যাতন করা হয়। গণধর্ষণ, মারধরসহ কোনো নির্যাতন থেকেই রেহাই দেয় না দুর্বৃত্তরা। এসব কারণেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া অর্থলুটসহ শত্রুতার জের ধরেও ঘটে হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হত্যার পর লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এজন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের দায়ী করেন তিনি। তিনি জানান, নানা তথ্যসংবলিত ফরম পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি গ্রহণ ও আলোকচিত্র ধারণের নিয়ম থাকলেও হোটেলগুলো তা না মেনেই বোর্ডারদের কক্ষ ভাড়া দিয়ে থাকে। যে কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও সঠিক তথ্যের অভাবে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।

ডিএমপি ডিসি (মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন্স) মাসুদুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, যে অপরাধী সে সব সময় চেষ্টা করবে তার পরিচয় গোপন করার। সুতরাং আবাসিক হোটেলে তারা ভুয়া পরিচয় নিয়ে ভাড়া নিবে এটা অস্বাভাবিক নয়। এমনিতে সবসময় আসামিদের ওপর আমাদের নজরদারি থাকে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj