টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংসদ নির্বাচন : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে চায় ইসি

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

এন রায় রাজা : পূর্বসূরিদের ব্যর্থতা কাটিয়ে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করার লক্ষ্যে নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা সে লক্ষ্যে কাজ করার জন্য অন্য ৪ কমিশনারকে পরামর্শ দিয়েছেন, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসারও পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ায় এবং এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করায় বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল ও ভোটারের কাছে কে এম নূরুল হুদা কমিশন কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), উপজেলা ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে কমিশনাররা জেলাভিত্তিক সফরে গিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র নির্বিঘ্নে জমা এবং ভোটে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দিকে নজর দিচ্ছেন। প্রয়োজনে তাদের মতামত শোনার দিকেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন কমিশনাররা।

সূত্র জানায়, বিএনপিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মতবিনিময়ের মাধ্যমে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইসি। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপিসহ ইসিতে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় বসারও চিন্তা করছে ইসি। এ ছাড়া সিইসিসহ ৪ কমিশনারের কেউ কেউ বিএনপির মনোভাব বোঝা ও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি চার নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে ইসি সচিবালয়ের সচিব ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। তিনি অন্য কমিশনার, সচিব

এবং ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্পষ্টত জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ (একাদশতম) নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে যাতে বিএনপিসহ সব বড় বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয় সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

সূত্র জানায়, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে একাধিকবার বিএনপির সঙ্গে সচিবালয়ে আলোচনার সুযোগ দিয়ে দলটির কাছে সিইসি এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, তিনি নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ও সব দলের সমান সুযোগ দিতে চান। ইসি সচিব মোহম্মদ আবদুল্লাহ জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ এই নতুন ইসির সময়কালে সব নির্বাচনে যাতে সব দলের অংশগ্রহণ থাকে তা আমরা আশা করি। আর এ লক্ষ্যে কমিশন কাজ করছে।

তিনি বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ অনেক দল অংশ না নেয়ায় নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আগামী নির্বাচন যাতে তেমন না হয় সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমরা বসতে চাই, তাদের মতামত নেয়াসহ ইসির প্রতি তাদের আস্থা বাড়াতে কাজ করতে চাই। তিনি বলেন, কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনসহ উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এ বিষয়ে নিশ্চয় একটা বার্তা বিএনপির কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইসির নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাকে নতুন ইসির প্রধান চ্যালেঞ্জ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর ইসির সাম্প্রতিক বৈঠকে নূরুল হুদা নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন বলে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ সময় সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেন, এই বাংলাদেশ কতগুলো অত্যন্ত সফল নির্বাচন উপহার দিয়েছে, আর যে নির্বাচনগুলো বিতর্কিত ছিল, তা কেন বিতর্কিত ছিল, তা বিশ্লেষণে আমি যাব না।

তিনি বলেন, নির্বাচন যদি প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক না হয়, যদি সব দলের অংশগ্রহণ না থাকে, তাহলে নির্বাচন বিতর্কিত হবেই। সুতরাং আমরা আশা করব, সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছি, এই ইসির অধীনে ছোট-বড় যত নির্বাচন হবে, সবগুলোকে আমরা সিরিয়াসলি নেব এবং জাতিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেব। এটি আমার অঙ্গীকার। আর এর জন্য প্রয়োজেন দলগুলোর মতামতও নেয়া হবে।

এ ধরনের কথা তিনি ও অন্য কমিশনাররা দেশের বিভিন্ন জেলা সফরকালেও বলেছেন। এমনকি জেলা ও উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কেউ কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ না করেন এবং প্রশাসন যাতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে।

সিইসি নূরুল হুদা বলেছেন, আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। আমরা যারা নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যোগদান করেছি, শপথ নিয়েছি, আমাদের একটাই কথা- দল মত নির্বিশেষে সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সবার আগ্রহ আমাদের নিয়ে, অতীতে কখনো এমনটি হয়নি। সাধারণ মানুষ, দল, আন্তর্জাতিক সংস্থা সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আশা করি, সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারব। আশা করি, বিএনপিসহ সবকটি দলই আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে। এ সময় ইসির কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। তাদের উদ্দীপ্ত করতে এবং মনোবল বাড়াতে নানা নির্দেশনাও দেন তিনি।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য প্রতিটি কমিশনের কিছু লক্ষ্য বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। কাজী রকিব উদ্দীন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে তার ক্ষমতার প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বা প্রভাবিত হয়েছেন। যার ফলে তার আমলে অনেক নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে দশম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মতো দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অংশ না নেয়া, ইউপি ও উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ইত্যাদি কারণে রকিব উদ্দীন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা কমে এসেছিল। তবে নতুন কমিশন এসেছে, কে এম নূরুল হুদা নিশ্চয় চাইবেন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মতো দল অংশ নিক। নির্বাচন প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ হোক। তাহলে জাতি একটি সফল সংসদ উপহার পেতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের কমিশনের আমলে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসতে রাজি হচ্ছিল না। দলটিকে আনতে আমরা তিন তিনবার তফসিল পাল্টাতে বাধ্য হই। এ নিয়ে কমিশন তাদের সঙ্গে কথা বলে। যার ফলশ্রæতিতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে রকিব উদ্দীন কমিশনের উচিত ছিল দশম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরো সময় নেয়া এবং প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হলে শুধুমাত্র কমিশনের ওপর নির্ভরশীল হলে চলে না, এর জন্য রাজনৈতিক দল, সরকার, প্রশাসন ও সর্বোপরি ভোটারদেরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন আরেক সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন। তিনি মনে করেন, নতুন কমিশন নিশ্চয় কিছু পদক্ষেপ নেবেন যাতে করে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে এবং একটি প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ নির্বাচন হবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ