সুইমিং শেষে রুমে ধর্ষণ করে সাফাত ও নাঈম : ভিডিও উদ্ধারে ফরেনসিক ল্যাবে যাচ্ছে মোবাইল ফোন

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : বনানীর রেইনট্রি হোটেলের সুইমিং পুলে সাতার কাটা শেষে রুমে নিয়ে এসে ভোর রাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ ছাত্রী ধর্ষণ করে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার সহযোগী সাদমান সাকিফ। ধর্ষণের ঘটনা বাথরুমের ফলস পার্টিশনের পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করে বিল্লাল। এরপর সাফাত পাশের রুম থেকে ভিকটিমদের বন্ধু চিকিৎসক শাহারিয়ারকে জোর করে তার রুমে নিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের গর্ভনিরোধক পিল খাওয়ানোর জন্য বলে। চিকিৎসক বন্ধু এতে রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর করে ইয়াবাসহ পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা সবার বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় রিমান্ডে রয়েছে ৩ জন। এরা হলেন- ধর্ষক নাঈম আশরাফ ওরফে হালিম, প্রধান আসামি সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও গানম্যান রহমত আলী। পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে আটকের পর নাঈম, বিল্লাল ও রহমত প্রাথমিকভাবে পুরো ঘটনা বর্ণনা দিয়েছে। মামলার আলোচিত আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক পুত্র সাফাত আহমেদ ও তার সহযোগী সাদমান সাকিফ গত বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও একই তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণ পদ রায় গতকাল শুক্রবার রাতে বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা ধারণকৃত ভিডিও রেকর্ড মুছে ফেলার কথা দাবি করছে। তবে রেকর্ড উদ্ধারের জন্য আটক ৪ জনের মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ৭ দিনের রিমান্ডে থাকা নাঈমের গতকাল শুক্রবার ছিল প্রথম দিন। ৪ দিনের রিমান্ডে থাকা সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেনের গতকাল তৃতীয় দিন এবং গানম্যান রহমত আলীর ছিল তিন দিন রিমান্ডের শেষ দিন। র‌্যাবের হাতে আটকের পরই বিল্লাল তদন্ত সহায়ক অনেক তথ্য দিয়েছে বলে জানা গেছে। রহমতের কাছ থেকেও পাওয়া গেছে সহায়ক তথ্য। নাঈম ধর্ষণের বর্ণনা দিলেও ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করেনি এমন দাবি করছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, বিল্লালকে আটকের পর গত মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে বিল্লালের জবানবন্দি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়- ধর্ষণ মামলার আসামি মো. বিল্লাল হোসেন (২৭), বাবা মো. সিরাজুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থানার দাড়িডোমা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ছ-৩৮/৬ নম্বর বাসায় থাকতেন।

র‌্যাবের বিজ্ঞপ্তি মতে, জিজ্ঞাসাবাদে বিল্লাল জানায়, ঘটনার দিন ২৮ মে বিকেল আনুমানিক ৪ থেকে সাড়ে ৪টার দিকে সে সাফাত আহম্মেদকে নিয়ে রেইনট্রি হোটেলে ৮ম তলার ভাড়াকৃত রুমে যায়। সাফাতকে হোটেলে রেখে সে গুলশান-২ নম্বর আগোরার পিছন থেকে সাফাতের একজন গার্লফ্রেন্ড ও তার বান্ধবীকে বনানীর ১১ নম্বর থেকে তার বান্ধবীসহ ২ জন তরুণী নিয়ে আনুমানিক সন্ধ্যে সাড়ে ৬টার দিকে রেইনট্রি হোটেলের ৮ম তলার রুমে গিয়ে সাফাত আহম্মেদের কাছে দিয়ে আসেন। ঐ সময় তিনি সাফাতের সঙ্গে আবু নাইম নামে আরেক বন্ধুকে দেখতে পান। বিল্লাল নিচে গিয়ে রাত ৮টা থেকে সোয়া ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। হোটেল থেকে সাফাত তাকে ফোন দিয়ে তার গানম্যান রহমতকে আমেরিকান অ্যাম্বাসি থেকে নিয়ে আসতে বলেন। সে রহমতকে নিয়ে নিকেতনে ভিকটিমের (মামলার বাদী) বাসার সামনে গিয়ে তাকে ফোন দিয়ে গাড়িতে তুলে তাকেসহ অপর ভিকটিমের বাসায় যায়। বাদীর বান্ধবী গিফ্টসহ রাত সাড়ে ৯টার দিকে রেইনট্রি হোটেলে যায়। তারা গাড়ি থেকে নামলে বিল্লাল গাড়ি পার্ক করে সবাইকে নিয়ে টপ ফ্লোরে যায়। আগোরা থেকে যে ২ তরুণীকে নিয়েছিল কিছুক্ষণ পরে তাদেরকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসে। পরে বিজয় নগর গিয়ে সাফাতের আর এক গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে টপ ফ্লোরে যায়। সেখানে সাফাত, সাকিফ ও বাদী এবং তার বান্ধবীকে সুইমিং করতে দেখে বিল্লাল। তখন ডা. শাহরিয়ারকেও সেখানে দেখে বিল্লাল।

র‌্যাবের দেয়া তথ্য মতে, বিল্লাল যখন গাড়ি সাফাতের বাসায় রেখে আবার হোটেলে ফিরে তখন রাত আনুমানিক ৪টা বাজে। তারপর সাফাত তাকে তার রুমে ডাকে। হোটেল রুমে যাওয়ার পর বিল্লালকে বাথরুমে (যেখানে ফলস পার্টিশন দেয়া সেখানে) দাঁড় করিয়ে রাখে। ওই সময়ে এক রুমে সাফাত, অন্য রুমে নাঈম ওই ২ তরুণীকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। এরপর পাশের রুম থেকে বন্ধু চিকিৎসক শাহরিয়ারকে জোর করে সাফাতের রুমে নিয়ে ২ তরুণীকে গর্ভনিরোধক পিল খাওয়ানোর জন্য বলে। তাদেরকে পিল খাওয়ার জন্য অনুরোধ না করায় তারা চিকিৎসককে ইয়াবা দিয়ে চালান দেয়ার ভয় দেখানোসহ মারপিট করতে থাকে। সেসময় পুরো ঘটনাটি বিল্লাল ভিডিও করে। বাদীকে সাফাত ধর্ষণের সময় বিল্লাল ২ বাথরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করে।

বিল্লাল র‌্যাবকে বলেছে, বনানী থানায় মামলা রেকর্ড হওয়ার খবর অনলাইনে দেখে সাফাত আহম্মেদ, সালমান সাকিফ, গানম্যান আজাদকে নিয়ে তারা গাড়িতে করে এয়ারপোর্টের দিকে যায়। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে গাজীপুর হয়ে মাওনা দিয়ে সিলেট চলে যায়। সাফাত আহম্মেদ ও সালমান সাকিফ সাফাতের নানার বাড়িতে থাকে। গানম্যানসহ বিল্লাল একটি রিসোর্টে থাকে। পরবর্তী সময়ে গানম্যান কোথায় যান সে বলতে পারে না। বিল্লাল সেখান থেকে ছাতক যায়। ছাতক থেকে আবার সিলেটে ফিরে। সিলেট থেকে বুধবার ভোরে ঢাকায় ফিরে দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে নবাবপুর এলাকায় উল্লেখিত বোর্ডিংয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ধর্ষণের অভিযোগ আনা ২ ছাত্রীর সঙ্গে প্রধান ৩ আসামির অনেক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করার কথা ভাবছেন মামলার বাদী। এর মধ্যে সাফাতের সঙ্গে এক ছাত্রীর আপত্তিকর ছবিও রয়েছে। বাদীর দাবি- একটা ছবি জোরপূর্বক তোলা হয়েছিল। পরে ফোন করে হুমকি দিয়ে বলা হয় যে, তারা সেসব ছবি ফেসবুকে ছেড়ে দেবে। তিনি আরো বলেন, এর বাইরে কিছু ছবি তারা ফটোশপের মাধ্যমে মাথা কেটে অ্যাডজাস্ট করে ফেসবুকে দিয়েছে। আর কটা ছবি ফেসবুক থেকে নিয়ে কারসাজি করেছে। ভিকটিমের দাবি, যেসব পেজ ও ফেসবুক ওয়াল থেকে ছবিগুলো দেখতে পেয়েছি সেসবের তালিকা করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করব।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ২ তরুণী। ওই ঘটনায় গত ৬ মে রাজধানীর বনানী থানায় অভিযুক্ত সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, বিল্লাল ও আজাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তারা। পরে গত ১১ মে বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট থেকে অভিযুক্ত সাফাত ও সাদমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ সদরের বিশেষ টিম ও সিলেট পুলিশ। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিল্লালকে পুরান ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে এবং রহমতকে গুলশান এলাকা থেকে আটক করা হয়। গত বুধবার রাতে নাঈম আশরাফ ওরফে আবদুল হালিমকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাফাত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে। সাদমান সাকিফ রেগনাম গ্রুপের মালিকের ছেলে এবং ওই গ্রুপের পরিচালক।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj