ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছেই : রোজা উপলক্ষে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

মরিয়ম সেঁজুতি : কেজিতে চিনির দাম ৮ টাকা ও ছোলার দাম ১০ টাকা করে বেড়েছে । ৫ টাকা করে দাম বেড়ে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকায়। ২৫০ টাকা ছুঁঁয়েছে রসুনের কেজি। খোলা বাজারে টিসিবির পণ্য ছাড়লেও আধা ঘণ্টায় ৪শ কেজি বুট ও তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে।

চাহিদা থাকলেও টিসিবির পণ্য সরবরাহ দিতে পারছে না। এদিকে বাজারে হু হু করে বাড়ছে পণ্যের মূল্য। অনেকের অভিযোগ গোডাউন থেকে পণ্য কালোবাজারে বিক্রি ও হরিলুট হচ্ছে। যে কারণে মালের টান পড়েছে টিসিবিতে। ফলে টিসিবির পণ্য না পেয়ে ক্ষুব্ধ ডিলার ও ক্রেতারা।

এদিকে বিভিন্ন মিল মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানি বেশি এবং মজুদ পরিস্থিতি ভালো থাকার পরও বাড়ছে এসব ভোগ্যপণ্যের দাম।

আসন্ন পবিত্র রমজান উপলক্ষে অতিরিক্ত মুনাফা করতে কারণ ছাড়াই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিলমালিক, পাইকার এবং খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর এতে ভোক্তাদের পকেট শূন্য হচ্ছে, কষ্ট বাড়ছে তাদের।

কাওরান বাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, টিসিবির ওয়েবসাইডে দেয়া দামের সঙ্গে বাজারের দামের তেমন কোনো মিল নেই। এছাড়া বাজারে পণ্যের দাম লেখা থাকার কথা বলা হলেও তার কোন দেখা পাওয়া যায় না বেশিরভাগ বাজারেই।

জানা গেছে, গত এক বছর ধরেই ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল। বিশেষ করে মোটা চালের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। গত কয়েক বছরের মধ্যে এ দাম সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে। শবে বরাতের আগে থেকেই ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে চিনি। রোজা শুরু হলে চিনির দাম আরো বাড়বে। দুই সপ্তাহ আগেও মিলগেটে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা। আর গত কয়েক দিনের ব্যবধানে এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫৯-৬০ টাকায়। এ চিনি পাইকারি বাজার ঘুরে খুচরা দোকানে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায়। ৫০ কেজির বস্তায় দেড়শ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে মিল পর্যায়ে। মূলত সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, ঈগলু, টিকে গ্রুপ, দেশবন্ধু এবং এস আলমের মতো আট থেকে দশটি গ্রুপ দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সিটি গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, মিলগেটে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ৫৮-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে তা ৬২-৬৩ এবং খুচরা পর্যায়ে ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজির প্যাকেট চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭২ টাকায় এবং খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ভোক্তাদের আশঙ্কা, পুরো রমজান মাসজুড়ে ভোগ্যপণ্যের অতিরিক্ত দাম কষ্ট বাড়াবে। ছোলার দাম বাড়া নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজার প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ছোলার ব্যাপক চাহিদা থাকে। তাই ওই সময় পর্যন্ত দাম বাড়বে। এরপর আবার ছোলার দাম স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ইতোমধ্যে অতিবৃষ্টি এবং হাওর এলাকায় বন্যার কারণে সবজির দাম বেড়ে গেছে। রাজধানীর বাজারে ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, রোজার আগেই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় অস্বস্তিতে রয়েছেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা। স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ দৈনন্দিন হিসেব-মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। যদিও ১৫ মে থেকে টিসিবি খোলা বাজারে স্বল্পমূল্যে ছোলা, তেল, চাল, আটাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য বিক্রি করছে। পণ্যের দাম বাড়ার জন্য খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারি বাজারকে। আবার পাইকারি বিক্রেতারা দুষছেন আন্তর্জাতিক বাজারকে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম এখন নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সরকারের মনিটরিং না থাকার সুযোগে সুবিধাভোগী অসৎ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে। বাজারে এত কিছু হচ্ছে তারপরও সরকারের কোনো তদারকি বা মনিটরিং নেই। মনিটরিং না থাকলে অসাধু ও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের তৎপরতায় নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সরকারি মনিটরিংয়ে দুর্বলতা থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আর এতে দাম বাড়ে জিনিসপত্রের।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর শ্যামবাজার, মৌলভী বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ানবাজারের বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছেন। সরজমিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারের গিয়ে দেখা যায়, কিচেন মার্কেটের দোতলায় গড়ে তোলা হয়েছে ছোলা ও চিনির অবৈধ গুদাম। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বড় ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্যের মজুদ বাড়িয়ে যাচ্ছেন।

দুমাস আগে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হতো ৬০ টাকায়। এক মাস আগে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকা কেজি। গত দুই সপ্তাহ আগে এর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। গত ২৮ এপ্রিল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকায়। গতকাল বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা কেজি। ভালো মানের ছোলার দাম আরো বেশি। যদিও টিসিবির অনলাইনে দেখা গেছে প্রতি কেজি ছোলার দাম বর্তমানে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় পাইকারি বাজারে বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে বেড়েছে। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে এক মাস আগে প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৪৬ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৫২ টাকা হয়েছে। আমদানি খরচ, পরিবহন ও ব্যবসায়ীদের মুনাফাসহ প্রতি কেজি ৭০ টাকা বিক্রি করলেই চলে; কিন্তু বাড়তি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা এর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। একই অবস্থা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও। এক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল সাড়ে ৮ টাকা। এখন বেড়েছে হয়েছে প্রায় ৯ টাকা। দেশে এক মাস আগে খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। ভালো মানের প্যাকেটজাত পেঁয়াজের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৩২ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে সাধারণ মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। মাঝারি মানের ৩৮ এবং একটু ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি দরে। ছোলা এবং পেঁয়াজের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে আরো বেশি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রোজা শুরুর আগে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে। তবে রোজার শুরুতে এগুলোর দাম কমে যাবে। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এসব পণ্য ব্যবহার করে, যারা খাদ্যপণ্য উৎপাদন করেন তারাও রোজা শুরুর আগেই চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনে ফেলবেন। ফলে রোজার শুরুতে চাহিদা কমে যাবে, তখন দামও কমবে।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এক মাস আগে নিম্ন মানের মশুর ডালের কেজি ছিল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা। খুব ভালো মানের ডালের কেজি ছিল ১৩৫ টাকা। বর্তমানে নিম্ন মানের মসুর ডালের কেজি ৯০ থেকে ১০০ টাকা। মাঝারি মানের ডাল ১২০ টাকা এবং খুব ভালো মানের ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ওই সময়ে মসুর ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১৬ টাকা। এক মাস আগে প্রতি কেজির দাম ছিল ৪২ টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ টাকায়। ঢাকার মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মঞ্জুর এলাহী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম কম। তবে পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খরচের কারণে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান অবস্থায় আছে। রমজান উপলক্ষে যদি নতুন করে কেউ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি করে তাহলে তা অনৈতিক বলে স্বীকার করেন এ ব্যবসায়ী। একই সময়ে রসুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এক মাস আগে দেশি বাজারে প্রতি কেজি রসুনের দাম ছিল ২১০-২৩০ টাকা। নিম্ন মানের কিছু রসুন ছিল ১৫০ টাকা কেজি। বর্তমানে তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের রসুন ২৩০ টাকায়, ভালো মানের রসুন ২৩০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ওই সময়ে এর দাম বেড়েছে সামান্য। একই সময়ে প্রতি কেজি রসুন ১৩৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৮ টাকা হয়েছে। আদার দাম ওই সময়ে কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এক মাস আগে প্রতি কেজি আদার দাম ছিল ৬০ থেকে ৯০ টাকা। এখন তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আদার কেজি ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩২ টাকা হয়েছে। এক মাস আগে বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ছিল ৮২ থেকে ৮৬ টাকা কেজি। এখন তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি। বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে গড়ে ১০৫ টাকা কেজি। অথচ ওই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম খুব সামান্যই বেড়েছে। প্রতি লিটার অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ৫৫ থেকে বেড়ে ৫৭ টাকা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের তেলেসমাতি : ভোগ্যপণ্যের আমদানি, মজুদ পরিস্থিতি এবং বাজার মূল্য নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যবসায়ীরা। ওই বৈঠকে দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ এবং রসুনের মতো ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, রমজানে যাতে ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে তার জন্য সরকার সব ধরনের সহায়তা করবে। দাম না বাড়ালে ব্যবসায়ীদের পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু মন্ত্রীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হচ্ছে। ট্যারিফ কমিশনের সদস্য আবদুল কাইয়ুম বলেন, ভোজ্য তেলের চাহিদা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে মজুদ আছে তার চেয়ে বেশি। চিনির চাহিদা প্রায় একই পরিমাণ, যার অনেক বেশি বর্তমানে মজুদ রয়েছে। প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ ঠিকমতোই আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো পণ্যের দামই বাড়ার কথা নয়।

ডলারের দাম বৃদ্ধির সুযোগ : কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, রমজানের পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) অনেক আগেই খোলা হয়েছে। এরই মধ্যে সেসব পণ্য বন্দরে এসেও গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানে পণ্য বিক্রিতে ব্যবসায়ীদেরও ভালো প্রস্তুতি (আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি) রয়েছে। অথচ এখনই বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। আরো কিছু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কারসাজির অভিযোগ তুলেছেন। এরপর অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে একদিনের ব্যবধানে ডলারের দাম প্রায় দুই টাকা পর্যন্ত কমে আসে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj