সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ গুলির বিচার কি হবে না?

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

গাইবান্ধায় আদিবাসী পল্লীতে পুলিশের গুলিতে ৩ জন সাঁওতাল খুন, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনের পর ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও নির্মম ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো বিচার বা সাঁওতালদের দাবি-দাওয়ার কোনো সুরাহা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের মামলা কিংবা সাঁওতালদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া খুবই হতাশাব্যঞ্জক।

গত বছর ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জে রংপুর চিনিকলের জমি দখলকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশের গুলিতে শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ নামে ৩ জন সাঁওতাল মারা যান। সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবারগুলো তখন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির চিত্রই তখন উঠে আসে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে। হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া ও অবরুদ্ধ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া এবং সাঁওতালদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার দাবি উঠেছিল সর্বমহলে। কিন্তু এখনো এসব দাবি পূরণ হয়নি। সম্প্রতি সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম-ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, জনউদ্যোগ ও আদিবাসী বাঙালি সংহতি সমাবেশ রাজধানীতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে বক্তারা ৮ মাসেও সাঁওতাল হত্যাকাণ্ডের মামলা কিংবা সম্পত্তি ফিরে দেয়ার ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের জন্য সংগৃহীত সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে যে শর্তের ভিত্তিতে ১ হাজার ৮০০ একর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছিল আখচাষ বাদ দিয়ে অন্য ফসল আবাদ ও স্থানীয় দুর্বৃত্তদের কাছে লিজ দেয়ার অশুভ চক্রান্তের কারণে সেই শর্ত মিল কর্তৃপক্ষ অনেক আগেই ভঙ্গ করেছেন। এখন ওই শর্তের ভিত্তিতেই বাগদাফার্ম এলাকার ওই সম্পত্তির মালিক আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালিরা। অবিলম্বে আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালিদের সম্পত্তি ফেরত দেয়ার দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে। সমাবেশে উত্থাপিত দাবিগুলো যে যৌক্তিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

উল্লেখ্য, সাঁওতালরা প্রথম থেকে অভিযোগ করে আসছেন প্রশাসনের ছত্রছায়ায়ই তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় উচ্ছেদে বাধা দিতে গেলে গুলি করে তিনজন মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। সাঁওতালদের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষের ভিটে আগের জায়গা ফেরত দেয়া হোক। অথচ উচ্ছেদের পরপরই তড়িঘড়ি করে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই সাঁওতালদের দাবিদাওয়া সব সময়ই উপেক্ষিত থাকছে সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে। একদিকে প্রশাসনের বৈরী আচরণ, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে সাঁওতালরা অনেকটা একঘরে অবস্থায় রয়েছেন। এটাও সত্যি যে, সাঁওতালরা তাদের ভূমির অধিকারের বিষয়ে যে দাবি তুলে আসছেন, সেই দাবি পূরণের বিষয়টি বেশ জটিল। তবে তা যত জটিলই হোক, যেহেতু তারা দেশের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সেহেতু তারা তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগটুকু করে দেয়া সরকারের দায়িত্ব। বিশাল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত এই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বসহ বিবেচনা করা উচিত। আলোচনার মাধ্যমে জমির অধিকার সংক্রান্ত বিষয়টি ফয়সালার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের দায়িত্বশীলদের। আমরা মনে করি, এ বিষয়টি সরকারের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা উচিত। সাঁওতাল বসতিতে গুলি-অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের ঘটনার অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক বিচার হওয়া উচিত। অবিলন্বে এ হত্যাকাণ্ডের সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে বিচার শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রতা বিচার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সাঁওতালরা এ দেশেরই পিছিয়েপড়া বঞ্চিত একটা অংশ। তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষায় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ