নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো আজ সময়ের দাবি

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের এই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। বর্তমান যুগে নির্বাচকমণ্ডলী বা ভোটারদের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে সরকার পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা। কারণ আধুনিক গণতন্ত্র হলো প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্রকে আরো পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার লক্ষ্যে আইনসভায় প্রকৃত সংখ্যাধিক্যের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমগ্র বিশ্বে কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর মাঝে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা হলো এমন এক প্রকার নির্বাচনী ব্যবস্থা যেখানে নারী-পুরুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ভোটারের ভোটদান নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে সংখ্যাধিক্য ভোটে বিজয়ী ব্যক্তি ওই এলাকার পক্ষ থেকে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মূল কথা হলো দেশের নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থীর সপক্ষে দেয়া ভোটগুলোর সমানুপাতে আইনসভার আসনসমূহ বণ্টিত হবে। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বসহ প্রায় ৮৬টি দেশে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রয়োগে সচেষ্ট রয়েছে। আমাদের দেশেও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো আজ সময়ের দাবি। তাছাড়া বর্তমান সরকার দিন বদলের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাই সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর করার বিষয়টি আমরা অনায়াসে বিবেচনায় নিয়ে আসতে পারি। কারণ গণতন্ত্র বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন বুঝালেও সেখানে সংখ্যালঘুদের নির্মূল করা হয় না। সেখানে সংখ্যালঘুদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়ে শাসনব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাহলে গণতন্ত্র আরো পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে সক্ষম হবে।

আমাদের দেশে নির্বাচনের সংস্কৃতি সন্দেহ প্রবণতায় পরিপুষ্ট। ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানি শাসন আমল, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ এমনকি পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও নির্বাচনী ফলাফল সব সময় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। প্রায় সব নির্বাচনে বিজিত দল নির্বাচনে সূ², স্থ‚ল বিভিন্ন কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনী ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতাকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সংসদ বর্জন করে রাজপথকে উত্তপ্ত করে চলছে। ফলস্বরূপ অকার্যকর হচ্ছে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতি হচ্ছে নির্বাচনের পর বিরোধী দলে অবস্থান করে শুধুমাত্র নিজেদের দলীয় স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নব্বই দিন অন্তর সংসদে গিয়ে হাজিরা দেয়া। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলও বিরোধী দলকে সংসদে উপস্থিতির বিষয়ে কোনো কার্যকর বা উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে না। ফলে বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলের আহ্বানে কোনো সাড়া দেয় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই কলুষিত চর্চা থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরো অধিক গ্রহণযোগ্য ও গণমুখী করতে হবে। সেজন্য আমরা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার অন্যতম পদ্ধতি চধৎঃু খরংঃ ঝুংঃবস বা দল তালিকা ব্যবস্থাকে আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে কার্যকর করতে পারি। ফলে কোনো দল কম সংখ্যক ভোট পেয়ে জাতীয় সংসদে বেশি সংখ্যক আসন লাভ করতে পারবে না। তাছাড়া এর মাধ্যমে শুধুমাত্র বড় দুটি রাজনৈতিক দলই নয়, অন্যান্য ছোট রাজনৈতিক দলগুলো কিছুসংখ্যক ভোট লাভ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব লাভ করার সুযোগ পাবে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক সরকার তত্ত্বগতভাবে নয় প্রায়োগিকভাবেও সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

কানাডার নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে জাতীয় এবং প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে ঈযরবভ ঊষবপঃড়ৎধষ ঙভভরপবৎ (ঈঊঙ) বা প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার হাতে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ কার্যক্রম পরিচালনা করাই প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার দায়িত্ব। আর প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার প্রথম কাজ হলো প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একজন করে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা। নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরুতে প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে প্রার্থীর তালিকা এবং স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী থাকলে তার তালিকাও নির্বাচনী কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দিতে হবে। নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দেবে নির্বাচনী কর্মকর্তার দপ্তর। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে এই নির্বাচনী ব্যয়সীমা মেনে চলতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে নির্বাচনী ব্যয় গণনা শুরু হবে। নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার দপ্তরের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, একটি নির্ভুল ও পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা তৈরি করা। কানাডায় অবশ্য একটি স্থায়ী ভোটার তালিকা রয়েছে। প্রত্যেক নির্বাচনের আগে এই স্থায়ী ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস করা হয়।

আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলসমূহের সচেতনতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল নিরপেক্ষভাবে গণনা ও প্রকাশ করা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টদের সজাগ দৃষ্টি রাখার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আইন প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ, যা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলসমূহের অর্থের উৎস কমিশনের কাছে তুলে ধরার বিধান করা হয়েছে। এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে আগামী দিনের সব নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কাতে সমানুপাতিক প্রতিধিত্ব ব্যবস্থা চালু আছে। দেশ দুটিতে এই ব্যবস্থার যথাযথ সুফল লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশে এই ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে এ দেশ সংকীর্ণ ও সংঘাতমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে বহুত্ববাদী ধারায় প্রবাহিত হবে এবং এখানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথটিও অনেক সহজ ও মসৃণ হবে।

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ : উপমহাপরিচালক, আনসার ও ভিডিপি (পিআরএল), আনসার-ভিডিপি একাডেমি, সফিপুর, গাজীপুর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj