রঙ্গ ভরা বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

কথায় বলে ‘রঙ্গ ভরা বঙ্গ’ বা বাংলাদেশ। এই রঙ্গমঞ্চে দর্শক কত রঙ্গই না দেখছে। সর্বশেষ হলো, ‘ফরহাদ মজহার অপহরণ’ নাটক। এই নাটক চলমান অবস্থায়ই এসে গেল ‘আ স ম রবের বাড়ি ঘেরাও’ একাঙ্কিকা। এর সঙ্গে আছে সংসদে অগ্নিকন্যার অগ্নিগর্ভ ভাষণ এবং ক্রিকেটার তামিম ইকবালের তাড়া খেয়ে দেশে ফেরা। সিনেমা যেমন নাচে-গানে ভরপুর থাকে, দেশের নাট্যমঞ্চ তেমনি রসালো ঘটনায় ভরপুর। তবে ঢাকায় ‘ট্রাম্প ক্যাফে’ উদ্বোধন ঘটনা এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ। বাংলাদেশে প্রায় সব মানুষ ট্রাম্পবিরোধী, এর মাঝে ঝিগাতলা-সাত মসজিদ রোড মোড়ে আধুনিক এই রেস্তোরাঁর মালিক নাকি ট্রাম্পভক্ত? ধারণা করি রেস্তোরাঁর বাইরের দেয়ালগুলো কাচের নয়, কে জানে কোন মিছিল থেকে কখন এর ওপর ঢিল পড়ে? যা হোক, ব্যবসায়ী আইডিয়া হিসেবে এটি সাহসী এবং চমৎকার উদ্যোগ। এর মধ্যে জবর খবর এল, পেয়ারা নিয়ে মারামারি করে ছাত্রলীগের ছাত্রীরা হাসপাতালে। ভাগ্যিস, এই পেয়ারা আসল পেয়ারা, এরশাদ নয়, এরশাদের ডাকনাম ‘পেয়ারা’।

ক্রিকেটার তামিম ইকবাল দেশে ফিরে এসেছেন। এসেই বলেছেন, তিনি তাড়া খেয়ে আসেননি। এমনিতেই এসেছেন। ঢাকার অন্তত দুটি কাগজে খবর এসেছিল, তামিম ইকবাল ও তার হিজাব পরা পতœীকে নাকি কিছু বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ তাড়া দিয়েছে। তাড়া খেয়ে তারা দেশে ফিরে গেছেন। লন্ডনের কাগজে এ নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো নিউজ নেই, যদিও এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিন্তু মামলা নেই? তামিমের এসেক্স ক্লাব এমন খবর দেয়নি, বরং বলেছে, তামিম এমনিতে দেশে গেছেন। বাংলাদেশের দু’একটি মিডিয়া হয়তো এ নিয়ে ‘বাহাস’ করতে চেয়েছিল, তাতে জল ঢেলে দিয়েছেন তামিম নিজে। ফেসবুকে এ নিয়ে অনেকের ঘুম নেই, কেন তামিম অস্বীকার করলেন ইত্যাদি। এ জন্যই হয়তো বলা হয়, ‘যার বিয়া তার খবর নাই, পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই’। বাংলাদেশের মিডিয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব নিয়ে নেতিবাচক খবরই বেশি থাকে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এরপরও সবাই কেন ইউরোপ-আমেরিকা আসার জন্য পাগল হয়ে ছুটছেন?

ভালো-মন্দ খবর আরো আছে। মিস লুইজিয়ানা হয়েছেন স্টেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী বাংলাদেশের সুন্দরী ফারহানা রইস। তাকে অভিনন্দন। এদিকে লসএঞ্জেলেসের বাংলাদেশি ডেপুটি কন্সাল কাজী আনারকলি পালিয়েছেন। ঠিক পালানো নয়, তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বদলি করা হয়েছে জাকার্তায়, তিনি সেখানে গেছেন। খবরে প্রকাশ, তার গৃহকর্মী ছয়মাস ধরে নিখোঁজ, মামলা হচ্ছে। তাই গ্রেপ্তার এড়াতে আগেভাগে পলায়ন। এর আগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের দুজন ক‚টনীতিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বোধকরি আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর ক‚টনীতিকদের ‘গৃহকর্মী’ সমস্যাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন। গৃহকর্মীরা শুধু ইমিগ্রেশনের জন্যই পালিয়ে যাচ্ছেন বিষয়টি তা নাও হতে পারে। নব্বই দশকের কথা : একজন প্রতিমন্ত্রী এসেছেন, ইউরোপের একটি শহরে। দূতাবাস তাকে একটি গাড়ি দেয় প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য। মন্ত্রী সর্বত্র ঘুরে বেড়ান, কিন্তু গাড়ির ড্রাইভারকে ‘তুই-তোকারি’ করতে থাকেন। ড্রাইভার দিন দুই সহ্য করেন, কিন্তু তারপর মন্ত্রীকে বলেন, ‘স্যার, আমি ড্রাইভার, আপনার বাড়ির চাকর না’। বলছিলাম কি, আমাদের কিন্তু এ বদভ্যাস আছে!

অতঃপর ফরহাদ মজহার অপহরণ নাটক। এর এখন যবনিকা ঘটা দরকার। আর কত ভুয়া নাটক? নাটক লম্বা হলে আকর্ষণ থাকে না। দেশশুদ্ধ মানুষের বুঝতে বাকি নেই, তিনি অপহৃত হননি। এরপরও তিনি গার্ডিয়ানকে বলেছেন যে তাকে নাকি অপহরণ করা হয়েছে। এত আদর-যতেœ অপহরণের ঘটনা বাংলাদেশে সত্যিই বিরল। তিনি হলেন চীনপন্থী বাম! হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, সা¤প্রদায়িকতাকে ভদ্র চেহারা দিতে আমদানি হয়েছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। তদ্রƒপ, মৌলবাদী শক্তির একাংশ নিজেদের বাহ্যিক চেহারাটা ভদ্রোচিত রাখতে ‘চীনপন্থী’ হয়ে যান? ফরহাদ মজহাররা তা-ই। আর শুধু তিনি কেন বাংলাদেশের প্রায় সব চীনপন্থী হিন্দু বিদ্বেষী, ভারত বিদ্বেষী, কট্টর সা¤প্রদায়িক। এতে অবশ্য অর্চনা রানীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে কোনো অসুবিধে নেই, কারণ অর্চনা ‘গনিমতের মাল’? বাংলাদেশে চীনাপন্থীদের চরিত্র এরকমই পবিত্র। এরা সুবেশধারী জামাত। জ্ঞানপাপী।

ফরহাদ মজহার কিছুকাল নিউইয়র্কে ছিলেন। খোলা হাওয়ার এ দেশে তখনো তার কিছু কেচ্ছাকাহিনী ছিল। তার অর্চনা কাহিনী শুনে দরবেশের গল্পটা মনে এল- এক দরবেশ বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখেন বন্য বাঘ একটি হরিণ শিশুকে বধ করতে উদ্যত। দরবেশ তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে হরিণ শিশুটিকে বাঁচিয়ে তার ডেরায় নিয়ে এলেন। এরপর? সন্ধ্যায় তিনি কচি হরিণের সুস্বাদু মাংস দিয়ে ডিনার সারেন। আমার মনে আছে, অনেক দিন আগেকার কথা, সেই বাবরি মসজিদ ঘটনার সময়। তখন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে। নিউইয়র্কে ম্যানহাটনে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে দাঙ্গার প্রতিবাদে একটি সমাবেশ হয়। ফরহাদ মজহার সেখানে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেছিলেন, ভারতে কিছু হলে বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বেই। অবশ্য এ নিয়ে তার সঙ্গে অনেকের বাকবিতণ্ডা হয়? ফরহাদ মজহারের কট্টর সাম্প্রদায়িক চেহারাটা সে দিনও একবার ফুটে উঠেছিল।

ফরহাদ মজহার নাটক চলা অবস্থাতেই ঢাকায় ‘আ স ম রব’ নাটক ঘটে যায়। ফরহাদ মজহারের সময় পুলিশ সঠিক ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু রবের বেলায় কাজটি ঠিক হয়নি। এরশাদের এই গৃহপালিত বিরোধী নেতা আশির দশকে মতিঝিলে জুতাপেটা হলেও তিনি একজন রাজনীতিক, সন্ত্রাসী নন। তাহলে পুলিশ তার বাড়ি ঘেরাও করল কেন? আর যেসব নেতা ওখানে উপস্থিত ছিলেন তারা কেউই সন্ত্রাসী নন। দুএকজন মৌলবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন বটে, কিন্তু তাই বলে পুলিশ এভাবে একজন নাগরিকের বাসভবন ঘেরাও করতে পারে না। স্বাধীনতার পরে আ স ম রব অনেক ভুল করেছেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তার ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। সামনে নির্বাচন। আ স ম আব্দুর রব একটি মোর্চা গঠন করতেই পারেন। হয়তো সে জন্য হয়তো অন্যদের ডেকেছেন, এতে ক্ষতি কী? এতে ভয়েরই বা কী আছে? শূন্যের সঙ্গে আরো কয়টা শূন্য যোগ দিলেও ফলাফল শূন্যই থাকে। যে সাত নেতা ওই ডিনারে গিয়েছিলেন, পুলিশ তাদের ডিনারটাই মাটি করে দিল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত টেলিফোনে আ স ম রবের সঙ্গে কথা বলে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো।

এদিকে মতিয়া চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে একহাত নিয়েছেন। তিনি সরাসরি প্রধান বিচারপতিকে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলে আখ্যায়িত করেন। এক কালের অগ্নিকন্যার মুখে আমরা এ কি কথা শুনছি! অবশ্য এ আর নতুন কী, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একদা ওনার উক্তি ছিল আরো কঠিন। এখন তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যার আস্থাভাজন। প্রবাদ আছে, কাজী বিচার করেন আল্লাহর নামে, কিন্তু রায় দেন সম্রাটকে খুশি করার জন্য? মতিয়া কাকে খুশি করতে চাইছেন? মাত্র কদিন আগে ঢাকার একজন নেতা ও কলামিস্ট আমায় প্রশ্ন করেন, সিনহাকে কে প্রধান বিচারপতি বানিয়েছেন? খালেদা জিয়া থাকলে কি তিনি এই পদ পেতেন? আমাদের দেশের এই এক সমস্যা, যিনি চাকরিটি দিয়েছেন, তার প্রতি কেন প্রধান বিচারপতিকে সর্বদা ‘নমনীয়’ থাকতে হবে? এই সমস্যার কারণেই হয়তো প্রধান নির্বাচন কমিশনার কখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না। কিন্তু এই প্রথম একজন প্রধান বিচারপতি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছেন। এটা দেশের জন্য কল্যাণকর। নির্বাহী বিভাগ যখন বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তখন বুঝতে হবে বিচার বিভাগ সঠিক পথে আছে।

নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার টানাটানি নতুন কিছু নয়। সমস্যাটা হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকতে রাজনৈতিক নেতারা বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়, কিন্তু এনারাই আবার বিরোধী দলে গেলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ‘দরাজ দিল’ হয়ে যান। বিচার বিভাগ একটি দেশের শেষ আস্থার জায়গা, এর মর্যাদা সেভাবেই থাকা উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন অ্যাটর্নি জেনারেলকে। কোনো কারণে প্রেসিডেন্টকে যদি বরখাস্ত বা গ্রেপ্তার করতে হয়, সেটা কিন্তু করতে হবে তারই মনোনীত অ্যাটর্নি জেনারেলকে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে যিনিই নিয়োগ দেন না কেন, তিনি শপথ নেন দেশের পক্ষে। তার আনুগত্য দেশের প্রতি। এতে সরকার বা গোষ্ঠী বিশেষ মনোক্ষুণœ হলে কিচ্ছু করার নেই? তাছাড়া যে কোনো প্রধান বিচারপতি ‘উড়ে এসে জুড়ে বসেন না’, তার একটি ট্র্যাক রেকর্ড থাকে। যোগ্যতার বলেই তাকে প্রধান বিচারপতি হতে হয়; যদিও যোগ্যতা থাকলেও সবাই প্রধান বিচারপতি হন না। এখানে সুরেন্দ্র সিনহা বিচার্য নন, তিনি আজ আছেন, কাল নেই, তার চেয়ে প্রধান বিচারপতির পদটির গুরুত্ব অনেক। রাজনীতিকরা ওখানে আঘাতটা না করলেই ভালো করবেন।

নিউইয়র্ক। ১৬ জুলাই ২০১৭

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ