পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কৃতি চর্চা থেকে উন্নত সংস্কৃতি চর্চার দিকে এগোতে হবে

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তির অভিঘাতে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা বদলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। চীন ভেতর থেকে বদলে গেছে। মার্কসবাদ কিংবা সমাজতন্ত্র এখন আর জীবন্ত আদর্শ রূপে নেই। গণতন্ত্রকে ‘উদার গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে নির্বাচনতন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে দুনিয়াব্যাপী যেসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে তাতে গণতন্ত্রের প্রতি জনমনে আকর্ষণ ও আস্থা নেই। জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদকে অপসারণ করে সামনে আনা হয়েছে বিশ্বায়নকে। বিশ্বায়ন উদ্ভাবিত হয়েছে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের ধারায়। বিশ্বায়নের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক, ব্যাপারগুলো অভিহিত হয় নিউ-লিবারিজম বলে। এটা পঁচানব্বই শতাংশ মানুষকে বঞ্চিত করে পাঁচ শতাংশ মানুষের স্বার্থ হাসিল করে নেয়ার মতবাদ। এই আদর্শগত শূন্যতার মধ্যে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ন্যাটো বাহিনী ও কথিত আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনী নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চালাচ্ছে আগ্রাসী সামরিক আক্রমণ ও যুদ্ধ। এর প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে তালেবান, আলকায়েদা, আইএস প্রভৃতি জঙ্গিবাদী সংগঠন। জঙ্গিবাদীরা জাতীয়তাবাদী। তারা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা চায়। তারা তাদের দেশ থেকে বিদেশি সৈন্যের অপসারণ চায়। তারা ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে চায়। তারা মুক্তির ধারা জানে না। দুনিয়াব্যাপী মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের দুদর্শা সম্পর্কে নীরব। বাংলাদেশে, ভারত জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চুক্তিবদ্ধ। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ও ভারতও জঙ্গিবাদী আক্রমণের বলয়ের মধ্যে আছে। এখনো বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী ধরা পড়ছে। জঙ্গিবাদীদের আক্রমণে বাংলাদেশে অনেকের প্রাণ গিয়েছে। তা ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে অন্তত দেড় হাজার লোকের প্রাণ গিয়েছে। ধারণা করা হতো জঙ্গিবাদীরা কওমি মাদ্রাসার ধারা থেকে উদ্ভূত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষিত, প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ধনী লোকদের ছেলেমেয়েরাও এতে আছে। নানা কারণে সরকার এখন পুলিশি ব্যবস্থা দ্বারা ‘জঙ্গিবাদ নির্মূলে’ তৎপর। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জঙ্গিবাদীদের উত্থানের প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে না, এ অবস্থায় সরকার জঙ্গিবাদ দমনে সংস্কৃতি চর্চাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমার মনে হয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে সরকার এগুচ্ছে। সংস্কৃতি সম্পর্কে উন্নত ধারণা নিয়ে এগোলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে। সরকার যেভাবে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি দিয়ে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন চালিয়ে নিচ্ছে, তাতে তো সংস্কৃতি থাকে না, অপসংস্কৃতি সংস্কৃতির স্থান দখল করে নেয়। ইউনেস্কো এটাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য বলে উৎসাহ দিচ্ছে এবং রক্ষা করার জন্য সরকারকে তাগিদ দিচ্ছে। ইউনেস্কোর কাজ উসকানিমূলক। ইউনেস্কো তো সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য নিয়ে এটা প্রচার করছে। এটা বাংলাদেশের ঐতিহ্য- এ কথা ইউনেস্কো জানল কী করে। ইলিশ-পান্তা খাওয়া, মুখোশ পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা- এসব এদেশে কিংবা পশ্চিম বাংলায় গ্রামে কিংবা শহরে কোথাও কোনো কালে ছিল না। ইউনেস্কো সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে কাজ করে বলেই এটাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য বলে সার্টিফিকেট দেয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, জাতিসংঘ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সংঘ। বঙ্গবন্ধু জনসভায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বলতেন, ‘উসকানিতে সাড়া দেবেন না।’

বাংলাদেশে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ‘মৌলবাদী’ বলে তিরস্কার করে। এর প্রতিক্রিয়ায় অপরপক্ষ প্রতিপক্ষকে ‘নাস্তিক’ ‘মুরতাদ’ ইত্যাদি বলে তিরস্কার করে। সংস্কৃতি নিয়ে এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সমাধান করতে হলে সংস্কৃতি সম্পর্কে উন্নত ধারণা অর্জন করতে হবে। বাংলা ভাষার গত সোয়াশ’ বছরের মহান লেখকদের রচনাবলিতে সংস্কৃতি সম্পর্কে উন্নত ধারণা লিপিবদ্ধ আছে। আমাদের উচিত সেগুলো উদ্ধার করা। সরকার পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কৃতিচর্চা থেকে উন্নত সংস্কৃতিচর্চার দিকে এগোতে পারে। সংস্কৃতি মানবীয় ব্যাপার। মানুষ ‘কৃষ্টিমান’ বা ‘সংস্কৃতিমান’ প্রাণী। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীই কৃষ্টিমান বা সংস্কৃতিমান নয়। মানুষ কেবল বেঁচে থেকেই সন্তুষ্ট থাকে না, উন্নতি করতে চেষ্টা করে। উত্তরাধিকার সূত্রে যে বৈষয়িক ও মানসিক সম্পদ মানুষ লাভ করে তার সঙ্গে সে নতুন নানা কিছু সংযোজন করতে চায়। এটাই কৃষ্টিমানতা বা সংস্কৃতিমানতা। ঈঁষঃঁৎব রং যিধঃ সধহ ধফফং ঃড় হধঃঁৎব. বেঁচে থাকার ও উন্নতি করার জন্য মানুষকে চিন্তা ও কাজ করতে হয়। অনেক কাজই অন্যদের সঙ্গে মিলে করতে হয়, একা পারা যায় না। এ জন্য সংস্কৃতি ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার যেমন, তেমনি সম্মিলিত জীবনেরও ব্যাপার। সংস্কৃতি হলো চেতনার অন্তর্গত সেই শক্তি যা মানুষের চিন্তায় ও কাজে উন্নতিশীলতা, উৎকর্ষমানতা, সৌন্দর্যমানতা, ন্যায়পরায়ণতা, উত্তরণশীলতা, প্রগতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রয়াস রূপে দেখা দেয়। সংস্কৃতি হলো ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনে সংস্কার প্রচেষ্টা- একদিকে নিজের ও নিজেদের অন্তর্গত সংস্কার এবং অপরদিকে নিজের ও নিজেদের পরিবেশের সংস্কার। জীবনযাত্রায় শিক্ষার ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের নিজেকে ও নিজের সমাজ ও পরিবেশকে উন্নত, সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার যে প্রবণতা চিন্তা ও চেষ্টা তারই মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি। ঢাকায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সহায়তায় যেভাবে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা হয় তাতে সংস্কৃতি কোথায়? শঠ, প্রতারক ও লোভীর প্রবণতা ও প্রচেষ্টা সংস্কৃতির পরিপন্থী। ‘সভ্যতা’ ও ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ সমার্থক। অবশ্য ব্যক্তিগত জীবনেও সভ্যতা ও অসভ্যতা- সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি আছে। জীবনযাত্রার, আশা-আকাক্সক্ষার এবং চিন্তা ও চেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মানুষের সংস্কৃতির পরিচয়। সমাজ জীবনে যত মন্থর গতিতেই হোক, পর্যায়ক্রমে অন্যায় কমানো ও ন্যায় বাড়ানো সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রগতিশীল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই সঙ্গে দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যরে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। বিপ্লবে ও ন্যায়যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে, কিন্তু প্রতিবিল্পবে ও অন্যায়যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে না- থাকে অপসংস্কৃতি। মধ্যপ্রাচ্যে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির, ন্যাটোর এবং তালেবান-আলকায়েদা-আইএসের কর্মকাণ্ডে সংস্কৃতি কোথায়? এতে তো রয়েছে চরম অপসংস্কৃতি। বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিমান হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের চুক্তিতে যেতে পারে?

সংস্কৃতি একদিকে আত্ম গঠনের এবং অন্যদিকে পরিবেশকে পুনর্গঠিত করার ব্যাপার। ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সংস্কৃতির বিকাশমানতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, অন্তরিন্দ্রিয় ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে, রাজনৈতিক দলে, রাজনৈতিক আন্দোলনে ও বুদ্ধিজীবীদের মহলে সংস্কৃতি জীবন্ত ও জাগ্রত থাকলে তা দ্বারা জনজীবনে অশেষ কল্যাণ সাধিত হয়। রাজনীতিবিদরা এবং বুদ্ধিজীবীরাই তো সমাজের নেতা, পরিচালক। তারা দুর্নীতিমুক্ত ও সংস্কৃতিমান থাকার চেষ্টা করলে সমাজ দুর্নীতিমুক্ত ও সংস্কৃতিমান হতে থাকে। ধর্মসভা করে যেমন সাধারণ মানুষকে ধর্ম বোঝানো হয়, ঠিক তেমনি সংস্কৃতিসভা করে সাধারণ মানুষকে সংস্কৃতি বোঝানো দরকার। যারা বুঝাবেন তাদের তো সংস্কৃতিমান হতে হবে! শ্রী অরবিন্দ (১৮৭২-১৯৫০)।

ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি (বাংলা অনুবাদ ১৯৬৯, অরবিন্দ আশ্রম, পণ্ডিচেরি; মূল গ্রন্থ ইংরেজিতে ঞযব ঋড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ ওহফরধহ পঁষঃঁৎব, গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য স্থাপনই সংস্কৃতির জীবন্ত লক্ষ্য।’ অরবিন্দ প্রথমত মানুষের মনোদৈহিক উন্নতিতে তারপর আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক উন্নতিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর জন্য সমাজে প্রগতিশীল নেতৃত্ব অপরিহার্য। জনসাধারণকেই নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হয়, জনগণ নিষ্ক্রিয় থাকলে, জনগণের মধ্যে চাহিদা না থাকলে, কখনো জনকল্যাণকর বা প্রগতিশীল নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না। যে জনসাধারণ যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয়, সেই জনসাধারণ তখন সেই রকম নেতৃত্বই তৈরি করে। নেতৃত্বের মধ্যে জনচরিত্রের প্রকাশ থাকে এবং নেতৃত্বের দ্বারা জনচরিত্র গঠিত হয়।

যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক দিয়ে পশ্চাৎবর্তী ও দরিদ্র, তাদেরও সংস্কৃতি আছে। জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে তারাও উন্নতি করতে চায়- তাদের মধ্যেও ন্যায়-অন্যায়বোধ, সৌন্দর্যবোধ ও সর্বজনীন কল্যাণবোধ আছে। ইচ্ছায় হোক কিংবা বাধ্য হয়ে হোক, অগ্রসর সংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারা সংস্কৃতিমান থাকে। আত্মবিকাশের পথে তাদের অন্তরায় অনেক। ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নিজেদের থেকে নিজেদের জন্য নিজেদের চেষ্টায় নেতৃত্ব সষ্টি করে তারা শক্তিশালী হতে পারে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। শক্তি ও অধিকার থাকলে তারা উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। অনৈক্যের মধ্যে তারা দুর্বল ও বঞ্চিত থাকে। যারা সৃষ্টিশীল নয়, সাধারণ মানুষ, তারা তাদের ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী ঐতিহ্য ও পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত সংস্কৃতি নিয়ে চলে। সরকারের ও সমাজের স্তরে স্তরে যারা নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব করেন জনগণের জীবনধারায় ও সংস্কৃতিতে তাদের ভালো-মন্দ নানা রকম ভূমিকা থাকে।

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় থাকে তার কর্মে ও ব্যক্তিত্বে। জাতির সংস্কৃতির পরিচয় থাকে জাতির আশা-আকাক্সক্ষায়, চিন্তায় ও কর্মে। জাতীয় সংস্কৃতিতে থাকে জাতির অন্তর্গত জনগণের সমষ্টিগত ব্যক্তিত্ব। তাতে ভালো ও মন্দ দুই-ই থাকে। ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত, ন্যায়-অন্যায়, রীতি-নীতি, আইন-কানুন, আচার-অনাচার, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে জাতির অন্তর্গত জনগণের স্বীকৃত ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে জাতীয় সংস্কৃতি বা সভ্যতা। তবে সর্বস্বীকৃত নয় এমন ধারণাও থাকে প্রত্যেক জাতির অন্তর্গত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জীবনে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। কোন জাতির অন্তর্গত জনগণের সব চিন্তা ও কর্ম এবং উৎপাদন ও সৃষ্টিই সেই জাতির সংস্কৃতির বাহন। পৃথিবীর দুইশ’র মতো জাতির প্রত্যেকটিরই সংস্কৃতিতে বিশিষ্টতা ও স্বাতন্ত্র্য আছে। এক জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য জাতির সংস্কৃতির সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য- দুই-ই থাকে। এক জাতি অন্য জাতির সংস্কৃতি থেকে গ্রহণও করে। উন্নতির জন্য ভালোর প্রতি গ্রহিষ্ণুতা অপরিহার্য। ব্যক্তিগত কিংবা যৌথ জীবনে সংস্কৃতি চেতনা যখন লোভ, হিংসা, ভোগসর্বস্বতা, ক্ষমতালিপ্সা, কুশিক্ষা, অসততা ইত্যাদি দ্বারা বিকারপ্রাপ্ত হয় তখন দেখা দেয় অপসংস্কৃতি। প্রত্যেক জাতির মধ্যেই সংস্কৃতি বিকশিত হয় অপসংস্কৃতির সঙ্গে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

বানরসদৃশ এক প্রাণী (ধঢ়ব) জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপন চিন্তাশক্তি ও শ্রম শক্তিকে ব্যবহার করতে করতে মানুষে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং সেই মানুষ আপন সংস্কৃতি চেতনার বলে পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উন্নতি করে চলছে। মানুষ পরিবেশকে পরিবর্তন করেছে এবং নিজেও পরিবর্তিত হয়েছে। গর্ডন চাইল্ডের বিখ্যাত বই গধহ গধশবং ঐরসংবষভ. এতে মানুষকে তিনি দেখেছেন সংস্কৃতিমান বিকাশশীল প্রাণী রূপে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজেদের গড়ে তোলা, সৃষ্টি করা, জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বিকশিত হয়ে চলা, সেই সঙ্গে পরিবেশকেও উন্নত করে চলা- এরই মধ্যে নিহিত থাকে ব্যক্তির কিংবা সমষ্টির সংস্কৃতি। সংস্কৃতি স্বতঃস্ফূর্ততার ব্যাপার যেমন তেমনি সজ্ঞান, সচেতন, সতর্ক চর্চারও ব্যাপার। উন্নতি বা প্রগতি নির্ভর করে সজ্ঞান চর্চার উপর। সংস্কৃতি ও প্রগতির জন্য ইডকে (রফ) দমন রেখে, ইগো (বমড়) ও সুপার-ইগোকে (ংঁঢ়বৎ-বমড়) অবলম্বন করে চলতে হয়। প্রগতি কার্যকর হয় প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করে- রক্ষণশীলদেরও সহায়তা নিয়ে।

ঞযব উবংপবহঃ ড়ভ গধহ গ্রন্থে ডারউইন উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কী করে জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের জীবনযাত্রার, পছন্দ-অপছন্দের ও কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে সৃষ্টি করে চলছে। এরই মধ্যে উন্নতির সজ্ঞান সচেতন প্রয়াসও থাকে- থাকে সাধনা ও সংগ্রাম। মনোগত উন্নতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উন্নতি- দুয়ের মধ্যেই মানুষের সক্রিয় ভূমিকাতে নিহিত থাকে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বিবেচনায় ংঃৎঁমমষব ভড়ৎ বীরংঃবহপব, হধঃঁৎধষ ংবষববঃরড়হ ্ ংঁৎারাধষ ড়ভ ঃযব ভরঃঃবংঃ প্রভৃতি ধারণাও বিবেচ্য। মানুষকে অস্তিত্ব রক্ষা করতে ও উন্নতি করতে হয় একদিকে প্রকৃতির প্রতিকূল ও অনুকূল নানা শক্তির মধ্যে জটিল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এবং অপরদিকে সমাজের অভ্যন্তরে জটিল সব সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

ডারউইনের অনুসরণে স্পেন্সার মানুষের নৈতিক আচরণের ও নৈতিক চেতনার ক্রমবিকাশের বিবরণ রচনা করেছেন। ইতিহাসের ধারায় পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নীতিতে আছে অভিযোজন (ধফধঢ়ঃধঃরড়হ)। গভীরে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, মানসিক শক্তিও শরীর-বহির্ভূত কিছু নয়। মানসিক শক্তিকে শরীর থেকে বা দেহ থেকে কোনো রকমেই আলাদা করা যায় না। মনকে পরিবেশ থেকেও কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না। পরিবেশের স্পর্শ কিংবা প্রভাব থেকে মুক্ত কোনো চেতনার কিংবা মনের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। মানসিক শক্তিও আসলে দৈহিক শক্তিই। মানসিক শক্তির মধ্যে থাকে নৈতিক শক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির শক্তি- আদর্শ উদ্ভাবন ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার শক্তি। নৈতিক উন্নতির জন্য জ্ঞানগত ও চিন্তাগত উন্নতির সঙ্গে পরিবেশের উন্নতি সাধনও অপরিহার্য। মানুষ সেই জৈবিক শক্তিরও অধিকারী যার বলে সে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা দ্বারা নিজের ও নিজেদের সংস্কৃতির পরিচয় দেয়। মানুষের বিবর্তনে মানুষ নিজেই কর্তা। সংস্কৃতির মর্মে প্রগতির তাড়না ক্রিয়াশীল থাকে। প্রাণিজগতে লক্ষ করা যায়, খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে খায়; বাঘ ও সিংহ হরিণকে মেরে খায়- কোনো প্রতিকার নেই। মানুষের সমাজে আছে প্রবল ও দুর্বল, শোষক ও শোষিত- জালেম ও মজলুম। এখানে প্রতিকারের উপায় আছে। দুর্বলরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের নেতৃত্ব সৃষ্টি করে শক্তিশালী হতে পারে, আর সংস্কৃতি অবলম্বন করে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ, সহযোগিতামূলক, সম্প্রীতিময় ও সৃষ্টিশীল করতে পারে। দুর্বলরা জেগে উঠলে প্রবলদের মধ্যেও আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও প্রগতির মনোভাব দেখা দেয়। এর জন্য দরকার হয় দুর্বলদের বঃৎহধষ ারমরষধহপব. অনুশোচনাহীন অপরাধীর সংখ্যা নগণ্য। তাদের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য।

সংস্কৃতির যে গভীরতর অর্থ আমরা সন্ধান করলাম, রাজনীতিতে সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে হবে সেই অর্থে। সংস্কৃতি প্রসঙ্গে ডারউইন, স্পেন্সার ও গর্ডন চাইল্ডের চিন্তাধারা, শ্রী অরবিন্দের চিন্তাধারা, বাংলাভাষার মহান চিন্তকদের গত সোয়াশ’ বছরের প্রগতিশীল সব ধারণা সব সময় মনে রেখে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপসংস্কৃতির জায়গায় সংস্কৃতি চাই।

আবুল কাশেম ফজলুল হক : বিশিষ্ট চিন্তাবিদ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj