কলাপাড়ায় চিকিৎসাসেবার বেহাল দশা আড়াই লাখ মানুষের দুর্ভোগ

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

পটুয়াখালী ও কলাপাড়া প্রতিনিধি : পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় জনবল সংকটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতাল, মহিপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ৮টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এখন চিকিৎসাসেবার বেহাল দশা। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কারণে উপক‚লীয় এলাকার আড়াই লাখ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসারসহ প্রায় ২০ পদ শূন্য রয়েছে। কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতালে প্রায় ১০টি পদ শূন্য রয়েছে। মহিপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার-১, মিডওয়াইফ-১ এবং উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডি. কর্মকর্তা-১টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া চাকামইয়া, লালুয়া, মিঠাগঞ্জ, নীলগঞ্জ, ধানখালী, ধূলাসার, লতাচাপলি ও টিয়াখালী ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সহকারী সার্জন এবং উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তার ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রথম শ্রেণির মঞ্জুরিকৃত ৩৬ পদের ২১টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৬ পদের ৯টি, তৃতীয় শ্রেণির ১৩০ পদের ৩২ এবং চতুর্থ শ্রেণির ৩৪ পদের ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৪ জন চিকিৎসক প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত আছেন। ফলে কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতাল, কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মহিপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ ৮টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন রোগী।

হাসপাতালের অপর একটি সূত্র জানায়, কতিপয় প্রভাবশালী প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক চিকিৎসকদের তার পরিচালনাধীন দুটি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানোসহ প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। এতে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের হাসপাতালের বাইরে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সপ্তাহে দু’একদিন অফিস করায় ভেঙে পড়েছে হাসপাতালের চেইন অব কমান্ড।

সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ডা. আব্দুর রহিম সিভিল সার্জন হয়ে ঝালকাঠি বদলি হওয়ার পর গাইনি চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন ডা. আবদুল ওয়াদুদ। তিনি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে দু’এক মাসের মধ্যেই গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তারপরও তিনি তার বর্তমান কর্মস্থল (ঢাকা) থেকে এসে কলাপাড়ার একটি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন।

সরজমিন কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জানা যায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে কাগজপত্রে ৮২ জন রোগী ভর্তি আছে। তন্মধ্যে ১০ জন রোগীর ভর্তি রেজিস্ট্রারে নাম থাকলেও তারা হাসপাতালে অনুপস্থিত। হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড এবং মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডের ফ্লোরে দেখা যায় অনেক রোগীকে। যারা চিকিৎসা নিতে দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালে এসেছেন সিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে ফ্লোরে থাকছেন সরকারি চিকিৎসা সুবিধা পেতে। এছাড়া নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ২০ শিশুকে দেখা যায় চিকিৎসা নিতে। পুরুষ ওয়ার্ডের ১০ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন লালুয়ার চান্দুপাড়া গ্রামের রফিক প্যাদা (৬৫) জানান, গত ২/৩ দিন আগে তিনি হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছেন। অদ্যাবধি হাসপাতালের কোােন খাবার জোটেনি তার ভাগ্যে। এ ক’দিনে একজন চিকিৎসক এসে তাকে দায়সারাভাবে একবার দেখে গেছেন। ৫নং বেডে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের খোকন মৃধা (৬৫)। তিনি কথা বলতে না পারায় তার ছেলে মো. ফরহাদ (৩৫) জানান, শুক্রবার সকালে হাসপাতালে তার বাবাকে ভর্তি করার পর রাতে একজন চিকিৎসক এসে দেখে গেছে। এরপর রোববার দুপুর পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক তার বাবাকে আর দেখেননি। ৯নং বেডে চিকিৎসাধীন নীলগঞ্জ ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামের আক্কাস মিয়া (৪০) জানান, গত ২০ দিন ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ক’দিনে বিছানার চাদর বদলানো হয়নি। বালিশের কভার নেই। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা। এমনকি হাসপাতালে তিনি যে খাবার খেয়েছেন তাও বর্ণনা করা কঠিন।

কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. জে এইচ খান লেলিন জানান, ৩১ শয্যার এ হাসপাতালটি ২০১২ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও রোগীর জন্য খাবার বরাদ্দ রয়েছে ৩১ জনের। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আবদুল মান্নান জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। রোগীদের খাবার মানের বিষয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দ অনুয়ায়ী রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj