পানি নামছে বাড়ছে ভাঙন : ত্রাণের অপেক্ষায় হাজারো মানুষ

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : দেশের বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট এমনকী সম্পূর্ণ গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এদিকে ত্রাণ না পেয়ে বন্যাকবলিত মানুষরা চরম দুর্ভোগে দিন পার করছেন। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষরা দিনভর চেয়ে থাকছে ত্রাণের আশায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইউনিয়ন চরবাগডাঙ্গার রোডপাড়া গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ওই গ্রামের ৯০টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তীব্র ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে ৩০০ কোটি টাকার পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্প। চরম হুমকিতে রয়েছে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কাইড়াপাড়া, মালডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রাম। গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কলমু এফএনসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের দুটি ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙনে ৮০টিরও বেশি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। পানির তোড়ে ও তীব্র ¯্রােতের ফলে চরাঞ্চলের কাঁঠালবাড়ি ও চরজানাজাত ইউনিয়নের ৮০টিরও বেশি ঘরবাড়ি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে এলাকার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঘরবাড়ি। কুড়িগ্রামের ৫২ ইউনিয়নের সাড়ে ৫০০ পরিবারের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ ১০ দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় তাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। ত্রাণ না পেয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন বেশির ভাগ পরিবার।

ভোরের কাগজ চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যানুযায়ী, সদর উপজেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা ইউনিয়ন চরবাগডাঙ্গার রোডপাড়া গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, জমিজায়গাসহ সর্বস্ব হারিয়ে ওই গ্রামের ৯০টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তীব্র ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্প। চরম হুমকিতে রয়েছে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কাইড়াপাড়া, মালডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রাম।

মালবাগডাঙ্গা গ্রামের সোহেল রানা মুকুল জানান, পদ্মার ভাঙনে দুই দাগে তাদের প্রায় ১০ বিঘার আম বাগান ও ফসলি জমি এ বছরই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহিদ রানা টিপু বলেন, মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, একটি মাদ্রাসা, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কাইড়াপাড়া ও মালবাগডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের গ্রামও হুমকিতে রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ শাহিদুল আলম জানান, গত দুইবছরে পদ্মানদীর তীব্র ভাঙনে প্রায় শ’খানেক ঘরবাড়ি, প্রচুর আম বাগানসহ অন্যান্য গাছপালা, কৃষি জমি বিলীন হয়েছে পদ্মায়। প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে নদী।

এদিকে ভোরের কাগজ গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদের বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কলমু এফএনসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। রেহাই পাচ্ছে না আবাদি জমি ও সাধারণের বসতভিটা। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র তীরের একাধিক স্থানে ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ফসলি জমিসহ শতাধিক ঘরবাড়ি। হাজারও মানুষ বিভিন্ন বাঁধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন।

ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি ইউপির চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান জানান, হুমকির মুখে রয়েছে জিগাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জিগাবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়, এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ ও জিগাবাড়ি কমিউনিটি ক্লিনিক।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নে ১৯০টি গ্রামে দুই লাখ ১০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২২৫ টন চাল, দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে অধিকাংশ মানুষ।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল জানান, নদীর তীরবর্তী এলাকার ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে পদ্মা নদীর পানি বাড়তে থাকায় মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের দুটি ইউনিয়নেও ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এ এলাকায় ৮০টিরও বেশি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে।

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বন্যায় কুড়িগ্রামে ত্রাণ পায়নি ৬০ ভাগ বন্যা দুর্গত মানুষ। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার ৫২ ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচশ পরিবারের প্রায় দুই লাখ মানুষ ১০ দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় তাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। ত্রাণ না পেয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে বেশির ভাগ পরিবার। চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরী উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের প্রায় ২০০ চর ও দ্বীপচরের প্রায় ৫০০ গ্রামের দুই লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। টানা ১০-১২ দিন পানিবন্দি থাকা এসব বানভাসি মানুষের ঘরে সঞ্চিত খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছেন তারা।

সরজমিন পরিদর্শন করে প্রতিনিধি জানান, বেশির ভাগ চরাঞ্চলের মানুষ নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় বসে থেকে দিন পার করছেন। এক বেলা খেয়ে না খেয়ে ঘরের ভেতর পাতা উঁচু মাচানে ছেলেমেয়ে নিয়ে রাত পার করছেন। এসব এলাকার মানুষ দিনভর চেয়ে থাকছে ত্রাণের আশায়।

কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেয়ার আলগারচর গ্রামের শাহজাহান আলীর স্ত্রী আলপনা বেগম জানান, ১২ দিন ধরে বাড়ির ভেতর এক গলা পানি। ঘরের ভেতর মাচান উঁচু করেও থাকার উপায় নাই। এজন্য পার্শ¦বর্তী একটি উঁচু জায়গায় ছেলেমেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে কোনো খাবার নাই। আমার স্বামী মানুষের নৌকায় করে যাত্রাপুর হাট থেকে ধার-দেনা করে সামান্য চাল নিয়ে এসেছে, তাও শেষ হয়ে গেছে। এখনো সরকারি কোনো সাহায্য পাইনি।

একই চরের রবিউল ইসলামের স্ত্রী শেফালী বেগম বলেন, ১০ দিন ধরে নৌকায় নৌকায় ঘুরছি। বাড়িতে থাকার কোনো উপায় নেই। না খেয়ে আছি। সাহায্য তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত কেউ দেখতেও আসেনি।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মসলার চরের দিনমজুর আবদুল মালেক জানান, চেয়ারম্যান ১০ কেজি চাল দিয়েছেন। বাড়িতে ৮ জন মানুষ। এ চাল দিয়ে ৩ দিনও যায়নি।

একই অবস্থা ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের গুজিমারিরচর, চর বাগুয়া ও চর দুর্গাপুর, চিলমারী উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের মাহনতলা, আমতলা, বড়াইবাড়ি, শাখা হাতি, কড়াই বরিশালসহ ২০০ চরাঞ্চলের।

চিলমারী উপজেলার অষ্টমীর চরের চেয়ারম্যান আবু তালেব ফকির, উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি এম আবুল হোসেন ও সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, তাদের ইউনিয়নের বন্যাদুর্গত পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩০ ভাগ পরিবারকে ত্রাণের ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। বাকি ৭০ ভাগ পরিবার খাদ্য সংকটে থাকলেও তাদের কোনো ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়নি।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, এ পর্যন্ত বন্যার্ত মানুষের জন্য ৪০০ টন চাল, ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা বিতরণ করা হয়েছে।

জামালপুর : জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানির ¯্রােতে দেবে গেছে কালভার্ট। পাশেই অন্য একটি কালভার্টও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া ওই প্রকল্পের ৩ কিলোমিটার পাকা সড়কটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজবাড়ী : পদ্মা নদীর রাজবাড়ী অংশে বন্যার পানি কমলেও নদীতে তীব্র ¯্রােত থাকায় জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ও বাহাদুরপুর, কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের হরিনবাড়িয়ার চর, জেলা সদরের মিজানপুর ও বরাট ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের অংশে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

সিলেট : সিলেটে বাড়ছে নদ-নদীর পানি। সিলেটের বিভিন্ন পয়েন্টে সুরমা-কুশিয়ারার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি কমতে থাকায় পূর্ব বগুড়ার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে বাঁধে আশ্রয় নেয়া লোকজন নতুন করে বন্যার ভয়ে এখনই বাড়ি ফিরছে না।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ