শেরপুরে টিলায় টিলায় সবজি চাষের বিপ্লব : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনেও ঘটেছে পরিবর্তন

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই ২০১৭

ইমরান রহমান, শেরপুর থেকে ফিরে : একটা সময় ছিল শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার হতদরিদ্র লোকজন জীবন কাটাত অনাহারে-অনিশ্চয়তায়। ঘরে খাবার থাকত না, থাকত না টাকা রোজগারের কোনো পথ, পাহাড়ের টিলায় ধান চাষ করে সেগুলো ঘরে তুলতে পারবে তারও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কারণ, বন্য হাতি এক রাতেই ধ্বংস করে দিত তাদের কয়েক মাসের কষ্টের ফসল। এমনকি সবজি চাষ করেও পাইকারের অভাব ও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আশার আলো দেখা হতো না তাদের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনেও ঘটেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

বর্তমানে নিজের জমি ও সরকারি জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তারা। কোনো কৃষক যাতে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত না হন সে জন্য নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন ভ্যালু চেইন। তাদের সবজি চাষের উপর কেন্দ্র করে শ্রীবরদীর কর্ণঝোড়ায় গড়ে উঠেছে পাইকার বাজার। সব কৃষক সারাদেশের বাজার দর পর্যালোচনা করে পাইকারদের কাছে সবজি বিক্রি করছেন। পাইকাররা ওই সবজি শুধু সারাদেশে না বিদেশেও রপ্তানি করছেন। সবজিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ করা হচ্ছে করলা। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছে সরকারি সহযোগিতায় চলা একটি সংস্থার চেষ্টায়।

সিঙ্গাবড়–য়া ইউনিয়নের মেঘাদল গ্রামের চাষি মো. আলম মিয়া জানান, করলা চাষের আগে তিনি ধান চাষ করতেন। কিন্তু বন্যহাতি এসে সব ধান নষ্ট করে দিত। পরে গত ৩ বছর আগে ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে একটি সংস্থার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে করলা চাষ শুরু করেন। করলা তিতা হওয়ায় হাতি নষ্টও করে না। আর পাহাড়ের মাটিতে করলার বাম্পার ফলন হয়।

ফলে আমরা যারাই করলা চাষ করেছিলাম সবাই লাভবান হই। এরপরের বছর সরকারি ২ একর জমি লিজ নিয়ে আবার করলা চাষ করি। এতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও লাভ হয় ১ লাখ টাকা। একপর্যায়ে আমাদের প্রতিবেশীরাও করলা চাষে উদ্বুদ্ধ হয়। এখন আমরা একসঙ্গে করলা চাষ করে একই দামে বিক্রি করতে পারছি। করলা শেষ হলে ওই জমিতেই লাউ, শিম, বরবটি, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া চাষ করে আরো আয় করা যায়। আমরা দিন দিন লাভবান হচ্ছি। ফলে আমাদের শিশুদেরও লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে পারছি।

কর্ণঝোড়া বাজারের পাইকার মো. এরশাদ আলী বলেন, প্রতিদিন সকালে ২০-২৫ জন পাইকারের সহায়তায় করলাসহ অন্যান্য সবজি সংগ্রহ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। বিদেশে পাঠানোর জন্য সবচেয়ে ভালো মানের করলা ক্রয় করা হয়। এ জন্য মণপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা বেশি দেয়া হয়। এ ছাড়া কৃষকরা ভ্যালু চেইনের আওতায় থাকায় আমরা একই মানের সবজি সংগ্রহ করতে পারি।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের শ্রীবরদী এডিপির ম্যানেজার অরবিন্দ সিলভেস্টার গোমস বলেন, শ্রীবরদীর কর্ণঝোরা, মেঘাদল, চন্দ্রপাড়া, মালাকুচা ও হারিয়াকোনা গ্রামের ৪৫০ জন হতদরিদ্র কৃষককে ৩ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ৫০ জনের সমন্বয়ে ভ্যালু চেইন প্রকল্প চালু করা হয়। এ বছর ৪৫০ একর জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে ২ হাজার ৭০০ টন। এই প্রকল্পের আওতায় প্রান্তিক ও হতদরিদ্র কৃষকের আয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে ওই সব পরিবার তাদের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসহ সামগ্রিক উন্নয়নের ব্যয় নির্বাহ করতে পারে।

শ্রীবরদী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, এই উপজেলায় ১৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান ও ৯০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়। তবে হাতি আটকানোর জন্য সরকারি সোলার ফ্যান্সিং প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষক চাষাবাদে আরো উদ্বুদ্ধ হবে। এ ছাড়া আমাদের ১০টি ইউনিয়নের জন্য ১০টি সিআইজি গ্রুপ আছে। তারা ফিল্ড পর্যায়ে থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও চাষাবাদে বিভিন্ন সহযোগিতা করেন। এর বাইরে ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো বিভিন্ন এনজিও আমাদের সহায়তা নিয়ে কৃষকদের জন্য কাজ করে থাকে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ