বন্যার্ত মানুষকে বাঁচান

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭

ছবি কথা বলে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায় বন্যার কড়াল গ্রাসে মানুষ কতটা বিপদাপন্ন। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পল্লীতে ত্রাণের জন্য হাহাকার বানভাসিদের এই ছবি বিপন্ন মানুষের করুণ বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। ঘোলাটে পানির তীরে দাঁড়িয়ে ত্রাণবাহী নৌকার দিকে হাত বাড়িয়েছেন অসংখ্য মানুষ। সামান্য সহযোগিতা পাওয়ার আশায় ব্যতিব্যস্ত এই বন্যার্ত মানুষেরা চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। উজানের ঢল ও বৃষ্টি কমার কারণে এখন বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বন্যা-পরবর্তী ক্ষত যে আরো ভয়াবহ।

গত কয়েকদিনের বন্যা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে অন্নহীন আশ্রয়হীন করে তুলেছে। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সরকারি সহযোগিতা। জানা যায়, সরকার গত দুদিনে বন্যার্তদের জন্য চাল ও বরাদ্দ প্রায় তিন গুণ এবং নগদ টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়িয়েছে। একই সময়ে বন্যায় আক্রান্ত জেলার সংখ্যা একটি ও বন্যার্ত মানুষের সংখ্যা ৯ লাখ বেড়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৯ আগস্ট শনিবার চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক বসেছিল। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ২৩টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন করে বরাদ্দ দেয়া ওই ত্রাণের কতটুকু বন্যার্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তার কোনো হিসাব বৈঠকে তুলে ধরা হয়নি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নেয়া ২২টি সিদ্ধান্ত ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন, তা এতে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এতে বন্যার্ত মানুষদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, দুর্গম ও চর এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত-ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো রক্ষায় সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বৈঠক ও আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে ঠিকই, তবে সাধারণ মানুষ এর সুবিধা কতটুকু পাচ্ছে। না সরকারদলীয় মফস্বল নেতাকর্মীরা তা নিজেদের করে নিয়েছেন?

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) ভারপ্রাপ্ত গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সরকার থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ত্রাণ দেয়ার যে হিসাব দেয়া হয়, তা সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পান না। সা¤প্রতিক সময়ে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশ ত্রাণ পেয়েছেন। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজনের সময় তা বন্যার্তরা পাচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে। বরাদ্দের সমপরিমাণ ত্রাণ মানুষ পাবে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার বাংলাদেশে বন্যা প্রলম্বিত হবে। বর্তমানে ভারতের বিহার ও আসামে বন্যা চলছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বন্যার ৮০ ভাগ পানি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। ওই পানির সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরের অতিবৃষ্টির পানি যোগ হয়ে বড় বন্যার আশঙ্কা আছে। এমনকি এটি ১৯৮৮ বা ১৯৯৮ সালের বন্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনটিস্টটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘তিন নদী অববাহিকাই একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি। এটা হলে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের মতো বড় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। বর্তমানে আসামে ব্রহ্মপুত্রের ওপরের অংশে বন্যা চলছে। সেই পানি বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীতে প্রবাহিত হবে। বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি এবং সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।’ এদিকে ভারতের আবহাওয়াবিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংস্থা আইএমডির চলতি সপ্তাহের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশটির পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, অরুণাচল, সিকিম রাজ্যে টানা ভারী বৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে ওই রাজ্যগুলোর বিস্তৃত এলাকা তলিয়ে গেছে। রাজ্যগুলো দিয়ে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও গঙ্গা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের ওই সব রাজ্যে ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে বাংলাদেশের বন্যা ও নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এছাড়া দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে হিমালয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে ব্রহ্মপুত্রের ভারত ও বাংলাদেশ অংশে পানি বাড়বে। গ্লোবাল এফএএসের গত ১০ আগস্টের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পুরো অববাহিকা ও গঙ্গার ভাটিতে ২০ বছরের মধ্যে এবং উজানে গত ২০০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।

বিভিন্ন মাধ্যমের এমন আশঙ্কাজনক বার্তা যদি সঠিক হয় তাহলে বন্যায় ভেসে যাবে বাংলাদেশ। মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হবে কোটি মানুষ। জনজীবন হয়ে পড়বে বিপন্ন। ব্যাপকহারে ঘটবে প্রাণহানি। হাহাকার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠবে বাংলার আকাশ বাতাস। শেষ পর্যন্ত বন্যাকবলিত লাখো মানুষ অন্তহীন ভোগান্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও খুঁজে পাবে না। বন্যার উদ্ভট পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহযোগিতাসহ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্যা-পরবর্তী উদ্যোগ গ্রহণ করলে সেটা হবে আত্মঘাতী। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে বন্যার সতর্ক বার্তা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আশঙ্কা অনুযায়ী যদি বন্যার ব্যাপকতা দেশের নিম্নাঞ্চল ভাসিয়ে দেয় তাহলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকলে হয়তো সাধারণ মানুষ কিছুটা সুবিধা ভোগ করবে। সে অনুযায়ী সরকারকে সামনে এগুতে হবে।

বিশ্বজিত রায় : লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
রমেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ

তাঁর জন্য কেঁদেই যাব

প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ

সেই বীভৎস নির্মম হত্যাকাণ্ড

Bhorerkagoj