কুরবানির হাট, ঈদে বাড়ি ফেরা ও যানজট

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান কুরবানি ঈদ সমাগত। সে জন্য একে বড় ঈদ বলা হয়। তাই এখন তিনটি জিনিস একসঙ্গে সামনে চলে এসেছে। সেগুলো হলো- কুরবানির উদ্দেশ্যে পশুর হাট, এরই মধ্যে চলছে বাঙালির শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরার পালা। আর সেই সুযোগে সৃষ্টি হয়েছে লাগামহীন যানজট। তাছাড়া মাত্র সদ্য সংঘটিত একটি বন্যার পানি নামছে এবং তাতে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতি বছরই ঈদ ফিরে আসে এবং সেই সঙ্গে নিয়ে আসে কিছু আনন্দ-বেদনার স্মৃতি। তবে সেখানে যত কষ্টই হোক সেটিকে যেন কেউ কষ্ট বলতে নারাজ। তাই আনন্দটাই সেখানে মুখ্য, কষ্টটা গৌণ।

ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য কষ্টের বিষয়গুলোও অনেকাংশে ঈদ-আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ এখানে আনন্দ-বেদনা একটি আরেকটির পরিপূরক। যেহেতু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের শিকড় গ্রামে গ্রোথিত, সে জন্য বছরের অন্য কোনো কালে সময় পাক আর না পাক ঈদে বাড়ি ফিরতেই হবে। সেখানে প্রিয়জনদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে হবে। তাই ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে থেকেই রেল, সড়ক, নৌ এবং আকাশপথে ঘরমুখো মানুষের জন্য অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করে দেয়। আর ঢাকাসহ বড় বড় শহরে কর্মরত কর্মজীবী মানুষ তাদের নিজ নিজ প্রাপ্তব্য সুযোগ বুঝে যাতায়াত শুরু করে।

অপরদিকে কুরবানি ঈদের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলো পশু কুরবানি করা। সেখানে যদিও দুই সপ্তাহ আগে থেকেই পশুর হাট জমতে শুরু করে মূলত জোরেশোরে চলে ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই। অর্থাৎ যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে পশুর হাটগুলো বসে থাকে, ঠিক সেই একই সময়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা শুরু হয়ে যায়। দুটি বিষয়ের সঙ্গেই মানুষের পরিচলন সম্পর্কিত। আর সে কারণেই বিষয়টি তখন একপ্রকার সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। কুরবানির পশুর হাটেরও যেমন গুরুত্ব রয়েছে তেমনি গুরুত্ব রয়েছে মানুষের বাড়ি ফেরা। আর সে কারণেই হচ্ছে রাস্তায় মারাত্মক যানজট। তবে এসবের সমন্বয় সাধন করতে পারলে হয়তো এতটা দুর্ভোগ হতো না।

সাধারণত যেসব স্থানে পশুর হাটগুলো বসে থাকে কিন্তু কুরবানির পশুর হাট আর সেসব নির্ধারিত স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না। আর পশুর হাটগুলো হয়ে থাকে কোনো বাজার বা ছোট-বড় রাস্তার পাশে। সে জন্য পশুর হাটের মানুষ এবং ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ভ্রাম্যমাণ পশুগুলোই তখন যানজটের জন্য প্রধানত দায়ী। যতই প্রশাসন কিংবা সরকার অথবা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে বলা হোক শৃঙ্খলার কথা। এক পর্যায়ে দেখা যায় আর কোনো কিছুই ঠিক থাকছে না। কারণ ধরা যাক, কোনো একটি সিটি কর্পোরেশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তার অংশে ৩০টি বৈধ পশুর হাট বসাবে। কিন্তু প্রয়োজনের চাহিদা এবং স্থানীয় চাপে দেখা গেল সেখানে আরো কমপক্ষে ১০টি হাট অতিরিক্ত বসাতে হলো, তখন তাদের শৃঙ্খলা বিধানে সবাইকে হিমশিম খেতে হবে বৈকি।

অপরদিকে দেখা যায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের কর্মজীবী মানুষের ছুটিও হতে থাকে এবং ঈদও সামনে আসতে থাকে। সেই সঙ্গে কমতে থাকে যানবাহন। কারণ যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কমানোর জন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কিছু নির্দেশনা দেয়া থাকে। উদাহরণস্বরূপ এক রুটের গাড়ি অন্য রুটে যেতে পারবে না, যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যাবে না, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো যাবে না, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না, গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ঈদ যখন একেবারে কাছে এসে কড়ায় নাড়ে তখন এসবের কোনো কিছুই আসলে দেখার লোকই থাকে না। তাছাড়া এবারের দেশের একটি বিরাট অংশজুড়ে ভয়াবহ বন্যায় রাস্তাাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো বিনষ্ট করার বিষয়টি তো রয়েছেই।

আর এসবের ফলে ঘটে যাওয়া পরিণতিই হলো ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য যানজট এবং পরিশেষে জনভোগান্তি। এগুলো দেশের সবখানে সমানভাবে ঘটে না। ঘটে মূলত রাজধানী ঢাকা শহর থেকে বের হওয়ার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দক্ষিণবঙ্গ, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-পূর্বাঞ্চল এবং সর্বোপরি ঢাকা-ময়মনসিংহ ইত্যাদি সড়ক মহাসড়কে। অপরদিকে নদীপথে মাওয়া-কাওড়াকান্দি, আরিচা-দৌলতদিয়া ইত্যাদি নদীবন্দরে ফেরি চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এগুলোর সম্মিলিত সমস্যার প্রতিফলনই হলো আসলে যানজট। অথচ বর্তমান জনবান্ধব সরকারের সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সব দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে জনগণের এসব দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যার একটি দেশে এসব পরিস্থিতিতে এসে আর কোনো ফর্মুলাই কাজ করে না ঠিকমতো। সে জন্য প্রয়োজন এসব সমস্যা সমাধানের জন্য নিজে থেকেই সচেতন হওয়া। যত দিন পর্যন্ত আমরা তা হতে না পারব তত দিন সরকার কিংবা একে ওকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। তবে যে কোনো মূল্যে ঈদের আনন্দময়তা কামনা করি।

ড. মো. হুমায়ুন কবীর : ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj