রোহিঙ্গা সমস্যা : আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডব-দাহন

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। মিয়ানমার উত্তপ্ত হলে তার আঁচ এসে লাগে বাংলাদেশেও। আঁচ বললে ভুল হবে- আসলে উত্তপ্ত মিয়ানমার আমাদের দেশকেও পোড়ায়, দগ্ধ করে। রাখাইন রাজ্যের মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশুরা ভাবে নাফ নদী পেরোতে পারলেই শান্তির সুবাতাসে তাদের পোড়া শরীর, পোড়া মন ¯িœগ্ধ হবে, শীতল হবে। কিন্তু শান্তি সুদূর পরাহত! উদ্বাস্তু-চাপে রাষ্ট্র বাংলাদেশও পুড়ছে, দগ্ধ হচ্ছে। আবার, ‘মুসলমান’ বলে অন্তর্গত এক বাড়তি চাপেও প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্র বাংলাদেশ, পিষ্ট হচ্ছে এ দেশের মানুষের বিবেকবোধও। রোহিঙ্গাদের নাগরিকই মনে করছে না তাদের নিজ জন্মভূমি! নিজ-রাষ্ট্র, বাংলাদেশ এবং শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে- যাকে বলে ‘পুশব্যাক’ করছে! তাই লাশের পর লাশ হয়ে রোহিঙ্গারা ভাসছে নাফ নদীর বুকে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বিশাল বক্ষে তাদের ঠাঁই হবেই। তাই রোহিঙ্গাদের লাশের মিছিলের অভিমানী গন্তব্য এখন বঙ্গোপসাগরের দিকেই ধাবমান!

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনেকটা নির্বিচারে চলছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ। সীমান্ত চৌকিতে রোহিঙ্গা জঙ্গি হামলার জের ধরে পরিচালিত সশস্ত্র অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যসহ এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। নাফ নদীতে ভাসমান নারী, পুরুষ এবং শিশুদের লাশের স্রোত আমাদের পুনরায় মানবিক মূল্যবোধের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এ কোন সভ্য সমাজের বড়াই করি আমরা? কোন গণতান্ত্রিক চেতনার বড়াই করি আমরা, কোন মানবিক মূল্যবোধের বড়াই করি আমরা? প্রাণ সংহারের এমন তাণ্ডব এখনো অব্যাহত আছে সেখানে। রাখাইনে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এআরএসএ সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালালে তার প্রতিশোধ গ্রহণে সরকারি বাহিনী এ নিধনযজ্ঞ চালায় বলে জানা যায়। ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে নির্বিচারে বেসামরিক নারী-পুরুষ এবং শিশুদের টার্গেট করে সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে- যুবকদের ধরে নিচ্ছে অজানা স্থানে। মিয়ানমার সরকারের অভিযোগ আরো মারাত্মক! তারা দাবি করছে এর পেছনে ‘বাংলাদেশের মদদ’ রয়েছে- হামলাকারীরা বাংলাদেশি বলেও প্রকারান্তরে উল্লেখ করেছে। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিকভাবেই এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের এ ধরনের প্রতি-আক্রমণ সভ্য সমাজের কাম্য নয়- এ ধরনের আক্রমণ মানবতাবিরোধী অপরাধ। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে একেবারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়- রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা। এর বিচারের কেউ নেই- নেই কোনো আদালত!

আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখছি মিয়ানমার সরকারের মদদেই সে দেশের সেনা, পুলিশ কিংবা নিরাপত্তারক্ষীরা এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। গত বছরের অক্টোবরেও এরূপ ঘটনায় সেখানে নিহত হয়েছিল অসংখ্য মুসলমান নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশু। মিয়ানমার সরকারের এ আচরণ বিশ্ববাসীর কাছে সে দেশের গণতন্ত্র ও বিশেষ করে সে দেশের অবিসংবাদী নেত্রী অং সান সু চির ‘রাজনীতি’-কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বিশ্বশান্তিতে নোবেল অর্জনের পর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অং সান সু চির সমর্থনকেও। রাখাইনে কোনো সহিংসতা ঘটলে তার রেশ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে। ইতোপূর্বে আশ্রিত পাঁচ লক্ষাধিক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গার অতিরিক্ত ২০১৬ সালের অক্টোবরে আরো ৮৬ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে এ দেশে। আর গত সপ্তাহে সৃষ্ট সংকটে ইতোমধ্যেই প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে, এদের মধ্যে আহতের সংখ্যাও কম নয়। অনুপ্রবেশের জন্য বিভিন্ন সীমান্তে আরো অনেক রোহিঙ্গা চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা যায়। উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করেও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা গুলি ছুড়ছে। ২৬ আগস্ট দুপুরে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবি বাংলাদেশ সীমান্তে সতর্কতা বৃদ্ধি করেছে। জানা গেছে, রাখাইনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি জ্বালাও-পোড়াও শুরু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। ২৭ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বসতি এলাকায় এবং মার্কেটগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগও করেছে বলে বিশ্বগণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চাপ সামলানোর জন্য বিজিবি সীমান্ত গেট বন্ধ করে দিয়েছে বলেও খবরে জানা যায়। তবে, তারা মানবিক অবস্থানে থেকে সম্ভব সহযোগিতা করছে। শরণার্থীর ভিড়ে উপচে পড়ছে নাফ নদী। কিন্তু মিয়ানমারের সেনা ও নিরাপত্তাবহিনী যাকে যেখানে দেখছে সেখানেই নির্বিচার গুলি করছে। তাই আশ্রয় প্রার্থীদের সর্বত্র আটকে রাখতে পারছে না সীমান্তের আইনি বাধা। ইতোমধ্যে নতুন করে পাঁচ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থানে বসবাস আরম্ভ করছে। বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ে পাশে থেকেছে সর্বদা। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সহনশীল এবং মানবিক আচরণ করেছে- এখনো করে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশেরও তো একটি সীমাবদ্ধতা আছে। জনসংখ্যার অত্যধিক চাপে এমনিতেই হিমশিম খেতে হয়। আবার এ বছর পরপর দেশের একাধিক অঞ্চলে উপর্যুপরি বন্যা হওয়ায় খাদ্য ঘাটতিরও আশঙ্কা আছে। এমতাবস্থায়, বাড়তি লোকসংখ্যার চাপ সামলানো আমাদের জন্য কষ্টকর হবে সন্দেহ নেই। তবু সরকার এখনো নমনীয়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের কাছ থেকে বাংলাদেশ বন্ধুসুলভ আচরণ পাচ্ছে না।

মিয়ানমার থেকে ইতোপূর্বে আগত অনুপ্রবেশকারীদের একটি বিরাট সংখ্যা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। স্থানীয় এদেশীয়দের সহায়তায় বিভিন্নভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট পর্যন্ত তাদের অনেকে সংগ্রহ করে নিয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন রকমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও এদের অনেকে যুক্ত হয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে চলেছে। এ রকম অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়- নানা সময়ে পত্রপত্রিকায় এ ধরনের খবর আমাদের চোখে পড়েছে। এবারের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ২৬ আগস্ট ২০১৭ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয় মিয়ানমারের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অং মিন্টোকে। এটি ক‚টনৈতিক প্রক্রিয়া ও শিষ্টাচার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি মিয়ানমার এই শিষ্টাচার খুব একটা মেনে চলছে না। তাই বৈশ্বিক চাপের পরও সমস্যা সমাধানে দেশটির আন্তরিক কোনো রূপ উদ্যোগ দেখি না। ‘সংখ্যালঘু’ বলে রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান অন্তত মিয়ানমার আন্তরিকতার সঙ্গে যে মোটেই চায় না তারই প্রমাণ বিভিন্ন সময়ে আমরা পেয়েছি। এবারো তার ব্যত্যয় ঘটেনি। চোখে আঙ্গুল দিয়ে মিয়ানমার আমাদের যেন তাই-ই দেখিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।

প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মিয়ানমার সরকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদপূর্বক উদ্বাস্তুতে পরিণত করছে তা বিশ্ববাসী কমবেশি অবগত আছে। এও বিশ্ববাসী অবগত যে, কেবলমাত্র মুসলমান বলেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়নে সু চির গোপন মনোবাসনা, শুধু তাই নয়- রাখাইনের মুসলমানদের বাংলাদেশি বলে প্রচারের মাধ্যমেও আমাদের আন্তরিকতাকে শীতল করে দেয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা দানের বিষয়ে জনমত সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের সেদিকে ভ্রæক্ষেপ নেই বিন্দুমাত্র, আর শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত অং সান সু চি অনেকটাই উদাসীন এবং রহস্যময়তায় আবৃত। কফি আনানকে প্রধান করে জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। কফি আনান কমিটির সুপারিশেও রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের পরিপূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা দানের প্রসঙ্গটি আছে। কফি আনানের কমিশনের প্রতিবেদন জমাদানের পরদিন ভোর থেকেই রাখাইন আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে, রক্ত¯œাত হয়ে উঠেছে সরকারি সেনাবাহিনীর তাণ্ডবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকারের মনোযোগ আমরা এখনো লক্ষ করছি না।

গত কদিনের সংঘর্ষে যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে তার অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। অপরদিকে হামলায় ১২ জন নিরাপত্তাকর্মী বাদে সবাইকেই ‘রোহিঙ্গা জঙ্গি’ বলে দাবি করেছে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের এরূপ দাবি অবিমৃষ্যকারিতার শামিল। কারণ, নিহতদের মধ্যে আছে দুগ্ধপোষ্য শিশুরাও। আর জীবিতরা সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে আবারো বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় জমিয়ে তুলছে, অপেক্ষমাণ রয়েছে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’। এর মধ্যে বিজিবি বহুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে সে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। আমরা খুবই অবাক হই অং সান সু চির মতো বিশ্ববরেণ্য নেত্রীর দল যখন দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতায়, তিনি নিজে যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত তখন এ ধরনের সংকট থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা আর নোবেল শান্তি পুরস্কারকে কলঙ্কিত করা- একই সমতলে বিবেচ্য। আশ্চর্যের বিষয়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে তার আন্তরিক প্রচেষ্টা একেবারেই শূন্য! অথচ এটাও কী আশ্চযেরও বিষয় যে, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একদা অং সান সু চির হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’! রাখাইন রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের ওপর মিয়ানমারের নিরাপত্তা কর্মীরা অকারণে নিপীড়ন, নির্যাতন এবং সর্বোপরি ঠাণ্ডা মাথায় যে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করছে তার জন্য সমগ্র বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ অস্বস্তি বোধ করছে। জন্মভূমি থেকে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের কোনো ক্রমে উচ্ছেদ বা উদ্বাস্তু করা যাবে না। একমাত্র জাতিসংঘই পারে দ্রুত রাখাইনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে। সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের আর দেখতে হবে না খাণ্ডব-দাহন, মানুষের রক্ত স্রোতধারায় রঞ্জিত নাফের জলরাশি।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj