বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিগত ৪৭ বছরে বিশ্ব পরিস্থিতির কতই না পরিবর্তন হয়েছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর, একানব্বইতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়ের আর বর্তমানের সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতি একেবারেই একরকম নয়। তিন সময়ে তিন ধরনের, আমূল পরিবর্তন হয়েছে বিশ্ব পরিস্থিতির। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি সবদিক থেকে এমন পরিবর্তন হয়েছে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। বিশ্ব মানচিত্র ও ভারসাম্যের যেমন পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্ক ও প্রভাব বলয়েরও পরিবর্তন ঘটে চলেছে। চিন্তা-চেতনা, মনমানসিকতা, নীতি-নৈতিকতা, জনমনস্তত্ত্ব প্রভৃতিরও পরিবর্তন হয়েছে। অনেক সময়েই মনে হয়, কেউ যদি সত্তরের দশক থেকে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে এখন হঠাৎই জেগে ওঠে, তবে তিনি পৃথিবীকে চিনবে না, অনেক কিছুই বুঝবে না।

অথচ চলমান অবস্থায় আছি বলে অনেক সময়েই এই পরিবর্তনটা আমরা বিবেচনার মধ্যে রেখে সবটা ভাবতে বা চিন্তার মধ্যে নিতে পারি না। এটা কার না জানা যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে যে ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগের সূচনা হয়, সেই যুগেরই এক পর্যায়ে সোভিয়েত-ভারত অক্ষ এবং আমেরিকা-চীন-পাকিস্তান অক্ষের পারস্পরিক লড়াই ও টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের সশস্ত্র সংগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে নবজাত বাংলাদেশ সোভিয়েত-ভারত অক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু পঁচাত্তরে হত্যা-ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ কমবেশি আমেরিকা- চীন-পাকিস্তান অক্ষের দিকে ঝুঁকে থাকে।

বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন হয় এবং পূর্ব ইউরোপের মানচিত্র পাল্টে যায়। এরই ফলে সমাজতন্ত্র বনাম ধনতন্ত্র ঠাণ্ডা যুদ্ধযুগের অবসান হয়। তখন আণবিক অস্ত্রে বলিয়ান হয়েও রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ে। ফলে আমেরিকার নেতৃত্বে এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার সূচনা হয় এবং আমেরিকার প্রবল আধিপত্যের কালপর্বকেই স্থায়ী মনে হতে থাকে। চীন তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ততটা শক্তিশালী ছিল না এবং মূলত আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার নীতি নিয়ে চলে। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়তে থাকে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার টানাপড়েন শুরু হয়। এই কালপর্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয় এবং বিশ্বের এখানে ওখানে আঞ্চলিক যুদ্ধ দেখা দিলেও বিশ্বযুদ্ধের বিপদ তেমন নেই বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। এই কালপর্বের সূচনায়ই বাংলাদেশে গণআন্দোলনের ভেতর দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটে এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ওই সময়ের মতো এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি নয়। আমেরিকার আধিপত্যবাদী এককেন্দ্রিক বিশ্ব অপসৃত হয়েছে। বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া আবারো আবির্ভূত হয়েছে এবং নিজ সীমান্তে প্রভাব অক্ষুণœ রাখা কিংবা প্রভাব বাড়াতে তৎপর থাকছে। তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের দেশগুলোতে নানাভাবে নানা রূপে যুদ্ধ ও সংঘাত লেগেই আছে। অফ্রিকা মহাদেশও যুদ্ধ ও সংঘাতে জর্জরিত। ফলে উদ্বাস্তু সমস্যা প্রকট, ভয়াবহ ও অমানবিক রূপ ধারণ করেছে। এদিকে এই সময়ে চীন সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মহাশক্তিধর হয়ে উঠেছে এবং ক্রমে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করছে। আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের দ্ব›দ্ব সংঘাত বাড়ছে বৈ কমছে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও আমেরিকার হুমকি-ধামকিকে উপেক্ষা করে চীনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ছায়ায় উত্তর কোরিয়ার আণবিক শক্তি পরীক্ষা ওই অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে রেখেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও চীনের মধ্যে ভুটান সীমান্তে উত্তেজনা চরম রূপ নিয়েছে এবং অস্ত্র প্রয়োগ না হলেও পাথর-যুদ্ধের ভেতর দিয়ে একটি পর্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা অনুমান করা যাচ্ছে না। উপমহাদেশে কাশ্মির ও জঙ্গি ইস্যু নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে এবং এদিক-ওদিক নানাভাবে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ লেগেই আছে। এদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অবস্থাও সুবিধার নয়। অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা বলা যায়, পারমাণবিকসহ মারণাস্ত্র উৎপাদন ও ক্রয়, অস্ত্রসজ্জা ইত্যাদি ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং উল্লিখিত যে কোনো অঞ্চলের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করেই যুদ্ধ ও সংঘাত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। পারমাণবিক যুদ্ধের ‘দোরগোড়ায়’ বিশ্ব, ‘ডামাডোলের’ মধ্যে বিশ্ব, এমন কথা এখন প্রায়শই উচ্চারিত হচ্ছে। এমন কথাও হচ্ছে যে, পারমাণবিক বোমা অনেক দেশের কাছে থাকার কারণেই বিশ্বযুদ্ধ বাধছে না। এই কথার আড়ালে আণবিক বোমায় সজ্জিত হচ্ছে পৃথিবী।

আরো একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করার মতো যে, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এখানে সেখানে যখন তখন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উগ্র জঙ্গি গ্রুপগুলোর আত্মঘাতী বোমা ও নাশকতামূলক হামলা বিশ্ব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। একদিক থেকে মানব-বোমা পারমাণবিক বোমার চাইতে যেন কার্যকর। পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের আগে হয়তোবা আঁচ করা যাবে। কিন্তু আত্মঘাতী বোমা ও নাশকতামূলক হামলার বিষয়ে আগে থেকে কিছুই বলার উপায় নেই। ট্রাক বা যানও এখন মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উগ্র জঙ্গিদের কাছে পারমাণবিক কেন্দ্রের মানচিত্র ও কাগজপত্র পাওয়ার পর এমনটাও এখন আলোচিত হচ্ছে যে, কখনওবা জঙ্গিদের কাছেও চলে যেতে পারে পারমাণবিক বোমা। পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকায় এদিক থেকে বিপদ বাড়ছে।

বস্তুতপক্ষে অস্থির অশান্ত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও যুদ্ধ যুদ্ধ লাগার মতো অবস্থায় বর্তমান বিশ্বে কখন কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা অনুমান করা কারো পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সোভিয়েত-আমেরিকা ঠাণ্ডা যুদ্ধ যুগে বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর কেন্দ্র ছিল দুটো। ওয়াশিংটন ও মস্কো ছিল মানবজাতির ভাগ্যবিধাতা। তারপর এককেন্দ্রিক বিশ্বে সর্বেসর্বা ছিল আমেরিকা তথা পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস। আর এখন কেন্দ্র হয়ে গেছে একাধিক। ফলে জটিলতার সঙ্গে ভয়াবহতা বাড়ছে। ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টা আগের অবস্থায় থাকছে না। ছোট এবং অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই সংকটাপন্ন দেশ উত্তর কোরিয়া পর্যন্ত আজ আমেরিকাকে আণবিক হামলার হুমকি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে। কিউবা সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে হুমকি দিয়েছিল আমেরিকা আর এখন তেমন হুমকি আমেরিকাকে দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। এমন বিশ্ব পরিস্থিতি অভিনবই বলা চলে।

বিশ্ব পরিস্থিতি এমনভাবে পরিবর্তিত হওয়ার কারণ মূলে নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে। এটা কার না জানা যে, বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পিছু পিছু আসে বিশ্ব রাজনৈতিক সংকট। পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার সংকট যুদ্ধবিগ্রহ ডেকে আনে। প্রকৃত বিচারে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশেষভাবে বড় ও শক্তিধর দেশগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্ষুধা পেলে যেমন নেকড়ে পাগল হয়ে যায়, তেমনি অর্থনৈতিক সংকট বড় দেশগুলোকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। বর্তমান দিনগুলোতে পাগলা কুকুরের মতো হন্যে হয়ে গেছে সবাই। যুদ্ধ, অস্ত্রসজ্জা, পররাজ্য গ্রাস বা প্রভাব বিস্তার, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন, মানবিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতায় ধস, ফ্যাসিস্ট আচরণ, মানুষের দুরবস্থা প্রভৃতি এই অবস্থার অনুষঙ্গ। বিংশ শতকের তৃতীয় দশকের অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়েই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জার্মানি ইতালি স্পেন ও জাপানে ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান ঘটে এবং পরিণতিতে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণের ভেতর দিয়ে ওই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

প্রসঙ্গত একবিংশ শতকের শুরু তথা ২০০৭ সাল থেকে তখনকার এককেন্দ্রিক বিশ্বের নেতা আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। পরবর্তী দুই বছরে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং বিশ্বের দেশে দেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। এই সংকটের ভেতর দিয়েই এককেন্দ্রিক বিশ্বনেতা আমেরিকার আধিপত্যে ধস নামে এবং বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কতক শক্তি কেন্দ্র অবস্থান নেয়। এই শক্তি কেন্দ্রগুলো এখন মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতায় বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে পরমাণু যুদ্ধের বিপদ যত বাড়ছে, ততই পুরনো বিশ্বের রীতিনীতি আইনকানুন নৈতিকতা মানবতা প্রভৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। দেশে দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত ও নীতি-নৈতিকতায় ধস নামছে। জাতিসংঘ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। জাতিগত ও ধর্মীয় জাত্যাভিমান এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য লাজলজ্জার বালাই না রেখে অশুভ প্রতিযোগিতায় সবাই যেন মেতে উঠেছে। হিংসা লোভ স্বার্থ প্রভৃতি পৃথিবীকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী শান্তি আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। বিশ্ব ও বিভিন্ন দেশের বিবেকবান মনীষীরা এই আন্দোলনে শামিল হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪ বছর আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ১৯৩৬ সালে মহামনীষী রম্যাঁ রোলাঁর আহ্বানে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রুসেলসে ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধবাদদের বিরুদ্ধে বিশ্বশান্তি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ওই কংগ্রেসে গৃহীত ইশতেহার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের মনীষীদের কাছেও পাঠানো হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘গভর্মেন্ট কর্তৃক পুস্তক ও পত্রিকাদি নিষিদ্ধ করা ও আরেক মহাযুদ্ধের বিরুদ্ধে’ ভারতে একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়। এতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নন্দলাল বসু, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ বাঙালি মনীষী ও রাজনীতিক জওহরলাল নেহেরু প্রমুখের স্বাক্ষর ছিল। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই শান্তি আন্দোলন বিশ্বযুদ্ধকে থামাতে পারেনি। যেমন পারেনি, মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আণবিক বোমা তৈরি ও ব্যবহার করার বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন ও আকুল প্রচেষ্টা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব বিবেকের এই প্রচেষ্টা থাকলেও যদি আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেই তবে দেখা যাবে যে, ওই দিনগুলোতে বিশ্ব ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে তেমন কোনো বিবেক জাগ্রত হয়নি। বরং দেশে দেশে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণভাবে স্ব-স্ব দেশের যুদ্ধবাজ শাসক ও শোষণকারীদের পক্ষে দাঁড়ায়। জ্যাতাভিমান ও শ্রেষ্ঠত্ব তখন বিবেককে নাড়া দিতে সক্ষম হয়নি। অন্ধত্ব ও গোঁড়ামি মানবসমাজকে পদানত করে রাখতে তখন সক্ষম হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাপর বিশ্ব ও বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হবে, মানবজাতি শান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির দিকে ধাবমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক অবস্থার পতন, সদ্য স্বাধীন দেশসমূহ তথা তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব, দেশে দেশে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার জয়গান অনেক আশা ও স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল মানবজাতির মনে।

কিন্তু ওই আশা ও স্বপ্ন যেন আজ ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। এখন বিশ্বে কোনো শান্তি ও সংহতি আন্দোলন নেই বললেই চলে। বিশ্ব বিবেক বা দেশে দেশে গড়ে ওঠা বিবেককে যেন অন্ধকার গ্রাস করেছে। জাত্যাভিমান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই অনেকটাই এখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো। একটু লক্ষ করলেই এটা বিবেচনায় আসবে যে, ছোট ও গরিব কোনো দেশও যদি এখন আণবিক বোমা বানাতে বা পেতে পারে, তবে সেই দেশের মানুষ খুশিই হবে। ‘ঘাস খেয়েও’ পারমাণবিক বোমা আজ পেতে ইচ্ছুক যেন সব দেশই। ধৈর্য, সহনশীলতা, পরস্পরিক আস্থা, গণতান্ত্রিক পরিবেশে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে অতীতে যে ধারণা গড়ে উঠে দানা বাঁধছিল, তা আজ দিবাস্বপ্নের মতো মনে হয়। এক কথায় প্রবীণ প্রজন্মের কাছে এই পরিস্থিতি আসলেই অসহনীয়।

এই ধরনের বিশ্ব পরিস্থিতি ও উপমহাদেশীয় পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমি বাংলাদেশ। তবে আমাদের জন্য আরো দুর্ভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধসহ ঐক্যবদ্ধ নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইতিহাসের দায় থেকে আমরা মুক্ত হতে পারছি না। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আমাদের জাতিকে বিভক্ত ও মুখোমুখি করে রেখেছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই এটা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির চাপ ক্রমেই আমাদের দেশের ওপর বাড়ছে এবং পরিস্থিতি কঠিন ও জটিল হচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুইজারল্যান্ড, শান্তির দূত। কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, বন্ধুত্ব হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক নীতির মর্মবাণী। আর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আমাদের জন্মলগ্নের অঙ্গীকার।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতিতে ওই মর্মবাণী ও অঙ্গীকারের পক্ষে সংযত আচরণ এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি। যে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল, অরাজক ও অশান্ত অবস্থা জাতীয় পরিস্থিতিকে অতিমাত্রায় বিপন্ন করে তুলতে পারে। পঁচাত্তরের হত্যা-ক্যুয়ের পর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনামলে যে পরিস্থিতি হয়েছিল, তার চাইতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যদি জাতীয় জীবনে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। তাই জনগণের ঐক্যবদ্ধ চেতনাকে জাগ্রত ও শানিত করা ভিন্ন বিকল্প নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারসহ সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জনগণ দায়িত্বশীল আচরণ কামনা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পানি ঘোলা করা বা আগুন নিয়ে খেলার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বিশ্ব ও উপমহদেশীয় পরিস্থিতি কোনো পর্যায়ে গিয়ে কী রূপ নিবে, তা এখনই বলে ওঠা কঠিন। এই অবস্থায়ও দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নয়নের জন্য প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন। পরিস্থিতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে যেমন দেশ জাতি ও জনগণের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে, উল্টোদিকে পরিস্থিতির শিকার হওয়া চলবে না। শোকের মাস শেষের এটাই জনগণের একান্ত কামনা।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj