স্বাধীনতা : শামীম শিকদার

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

রাইফা সবেমাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে, খুব চুপচাপ একটি মেয়ে। বাবা-মার অবাধ্য হয় না কোনো সময়। বাবা-মা যা বলে বাধ্য মেয়ের মতো সব মেনে নেয় যদিও বায়না ধরার অভ্যাসটি তার একটু বেশি। সপ্তাহে একদিন বাবা-মা তার কাছে থাকে আর বাকি ৬ দিনই অফিসের কাজে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চলে যেতে হয় আবার ফিরতে হয় প্রায় মধ্য রাতে। তার বায়নাগুলো হচ্ছে প্রতি শুক্রবার তাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, নিত্যনতুন জিনিস কিনে দিতে হবে, কয়েকটি শখ পূরণ করতে হবে। এমন করে প্রতি শুক্রবারই রাইফাকে নিয়ে তার বাবা-মা ঘুরতে বের হয় হঠাৎ করে একদিন সে এক অদ্ভুত বায়না ধরে বসল তার একটি টিয়া পাখি চাই। কিন্তু তার বাবা-মা কিছুতেই রাজি হলো না, তাদের কথা- রাইফা তুমি ছোট মেয়ে টিয়া পাখিটিকে ঠিকমতো সেবাযতœ নিতে পারবে না যার ফলে পাখিটি মারা যেতে পারে। কে শুনে কার কথা সে কান্না করতে শুরু করল। অবশেষে পাখিটি কিনে একটি খাঁচায় করে বাসায় নিয়ে এল সঙ্গে কয়েকটি খাবারের প্যাকেট।

রাইফা নিয়মিত পাখিটির যতœ নেয়, ক্লাসের সব বন্ধুর মতো পাখিটির সঙ্গে গল্প করে, মাঝে মাঝে মা-বাবার কথাও বলে। জানো, টিয়া বন্ধু আমার মা-বাবা অনেক পচা। সকালে আমাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় ফিরে সেই অনেক রাতে যখন কিনা আমি ঘুমিয়ে থাকি। কিন্তু তুমি কত ভালো, আমার সঙ্গে গল্প কর, সারাদিন আমার ঘরে আমার অপেক্ষায় বসে থাক। এমনভাবেই প্রতিদিন তার নতুন টিয়া বন্ধুর সঙ্গে গল্প করে, তার বন্ধুটিও যেন চুপ করে তার কথা শুনে, একটুও দুষ্টুমি করে না। কিন্তু ক্লাসের বন্ধুরা কত দুষ্ট মারামারি করে, কলম নিয়ে যায়, সামনের বেঞ্চে বসতে দেয় না। রাইফার সব বন্ধুর মধ্যে টিয়া বন্ধুটি তার অনেক প্রিয় কারণ সে কোনো দুষ্টুমিতে নেই, যখন তখন তার সঙ্গে গল্প করে। প্রায় গোধূলি বিকেলে টিয়া বন্ধুর কাছে বসে তাকে রাজারানীর গল্প শোনায়। সেও চুপটি করে বসে তার কথা শুনে। সত্যিই যেন টিয়াটি রাইফার একজন প্রকৃত বন্ধু। একদিন কথা না বললে মন খারাপ লাগে তাই স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় ব্যাগ রাখার আগেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে নেয়।

রাইফার আরেকটি বন্ধু আছে তা হচ্ছে টিভি যা টিয়া বন্ধুর মতো এত ভালো নয়। টিভিতে সে কার্টুন দেখে সঙ্গে টিয়া বন্ধুটিও থাকে। সে যখন কার্টুন দেখতে বসে তার কোলে টিয়া বন্ধুটিকে নিয়ে নেয়। রাইফার স্কুলের আরিফ স্যার বাংলা ক্লাস নেয় খুব ভালো পড়ায়। আজ তাদের ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে বুঝাচ্ছে। কোনো ব্যক্তির অধীনতাকে স্বাধীনতা বলে না। প্রতিটি জিনিসেরই স্বাধীনতা থাকা দরকার যেমন দরকার মানুষের তেমন দরকার পশুপাখিরও। মানুষ যেমন স্বাধীনতা লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে তেমনি পশুপাখিও মুক্তভাবে চলার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কথাগুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনছে রাইফা। সে মনে মনে ভাবছে তবে কি তার টিয়া বন্ধুটিও পরাধীনভাবে জীবনযাপন করছে কিন্তু সে তো তার সঙ্গে কথা বলে নেচে নেচে তাকে আনন্দ দেয়। টিয়া বন্ধুটির খাঁচা খুলে দিলে কি সে চলে যাবে? নাহ যাবে না কারণ তার চেয়ে বেশি ভালোবাসবে এমন কে আছে? তবে কেন সে চলে যাবে এসব প্রশ্ন বারে বারে রাইফার মনে নাড়া দিচ্ছে। সব শেষে সে সিদ্ধান্ত নিল পাখির খাঁচাটি খুলে দেখবে সে চলে যায় কিনা। যে সিদ্ধান্ত সে কাজ। স্কুল থেকে বাসায় যেতে দেরি হলেও খাঁচাটি খুলতে দেরি হয়নি। খাঁচাটি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ফুড়–ৎ করে টিয়াটি জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেল।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj