তিন ধর্ষকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি : টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে তরুণীকে গণধর্ষণের পর ঘার মটকে হত্যা

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

কে এস রহমান শফি, টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর ঘার মটকে হত্যা করে লাশ মধুপুরে বনে ফেলে রেখে যাওয়া ছাত্রীর পরিচয় পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে তিন বাস শ্রমিক গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা সবাই চলন্ত বাসে ল কলেজের ছাত্রী রুপা প্রামাণিককে ধর্ষণ ও হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

পুলিশ ও ওই তরুণীর পারিবারিক সূত্র জানায়, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে গত শুক্রবার বগুড়ায় যান রুপা। পরীক্ষা শেষে এক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা ৭টায় ময়মনসিংহগামী ছোঁয়া পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৩৯৬৩) বাসে ওঠেন। ওই সহকর্মীর কর্মস্থল ঢাকায় হওয়ায় তিনি টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় নেমে যান। আর ওই বাসেই রুপার ময়মনসিংহে পৌঁছানোর কথা ছিল।

রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত রুপার সঙ্গে তার বড় ভাই হাফিজুর রহমান প্রামাণিকের মুঠোফোনে যোগাযোগ ছিল। সঠিক সময়ে রুপা ময়মনসিংহে না পৌঁছানোয় সহকর্মীরা তার মোবাইলে ফোন করেন। এক যুবক ফোনটি ধরে বলেন, ফোনের মালিক ভুল করে সেটি ফেলে গেছেন। এরপর সংযোগ কেটে দেন। এরপর থেকেই ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।

এদিকে শনিবার সকালেও রুপা কর্মস্থলে না যাওয়ায় তার অফিস থেকে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের কাছ থেকে রুপার নিখোঁজ থাকার কথা জানতে পেরে হাফিজুর রহমান ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে মধুপুরে একটি লাশ পাওয়ার খবর মিডিয়ায় দেখে থানায় যান।

মধুপুরের ওসি সফিকুল ইসলাম বলেন, রুপার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর গত সোমবার রাতেই বাসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন হাফিজুর। ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ছোঁয়া পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার, সহকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায় তাদের কাছে। ছোঁয়া পরিবহনের বাসটিও জব্দ করা হয়।

থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। পরে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়। বিকেল চারটার দিকে গ্রেপ্তারকৃত বাসের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীরকে (১৯) টাঙ্গাইল বিচারিক হাকিম আদালতে নেয়া হয়। আকরাম ও জাহাঙ্গীরের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। শামীমের বাড়ি মুক্তাগাছার নন্দিবাড়ি।

টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম কিবরিয়া আসামি আকরামের, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম আসামি শামীমের এবং সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শামছুল হক আসামি জাহাঙ্গীরের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। পরে তাদের টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

গ্রেপ্তারকৃত বাসের চালক হাবিব (৪৫) এবং সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) আজ বুধবার আদালতে হাজির করা হবে। তাদের দুজনের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে।

রুপা প্রামাণিক (২৫) সিরাজগঞ্জের তারাশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জিলহাস প্রামাণিকের মেয়ে। তিনি বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ¯œাতক সম্মান ও ¯œাতকোত্তর সম্পন্ন করে ঢাকা আইডিয়াল ল কলেজে এলএলবি শেষ পর্বে অধ্যয়নরত ছিলেন। পাশাপাশি ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রমোশনাল বিভাগে শেরপুর জেলায় কাজ করতেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মধুপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা পুলিশকে জানিয়েছে, ওই দিন রুপা ছাড়া মাত্র পাঁচ/ছয়জন যাত্রী বাসে ছিল। অন্য যাত্রীরা সিরাজগঞ্জ মোড় এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নেমে যায়। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার সময় রুপা একাই বাসে ছিলেন।

বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাছাকাছি এলে বাসের হেলপার শামীম রুপাকে জোর করে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। এ সময় রুপা তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মুঠোফোন শামীমকে দিয়ে তাকে ধর্ষণ না করতে অনুরোধ করে। কিন্তু শামীম প্রথমে রুপাকে ধর্ষণ করে।

পরে অন্য হেলপার আকরাম ও জাহাঙ্গীর তাকে ধর্ষণ করে। বাসটি ঘাটাইল উপজেলা এলাকা অতিক্রম করার সময় তাদের ধর্ষণ শেষ হয়। এ সময় রুপা কান্নাকাটি ও চিৎকার করা শুরু করলে তারা তিনজন মুখ চেপে ধরে। একপর্যায়ে ঘার মটকে রুপাকে হত্যা করা হয়। পরে মধুপুর উপজেলা সদর অতিক্রম করে বন এলাকা শুরু হলে পঁচিশ মাইল নামক স্থানে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রেখে চলে যায়।

শুক্রবার রাতেই পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। শনিবার টাঙ্গাইল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে অজ্ঞাত পরিচয় লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরদিন পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মধুপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ওসি সফিকুল ইসলাম জানান, চালক ও সুপারভাইজার ধর্ষণে অংশ না নিলেও তাদের সামনেই ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং তারা লাশ ফেলতে সহায়তা করেছে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj