মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিমের কুরবানির গরু বিলুপ্তির পথে

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সীগঞ্জ থেকে : জেলার মিরকাদিমে কুরবানির সময় বিশেষ জাতের সাদা গরুর কারণে দেশজুড়ে এলাকাটির নাম শোনা যেত। বিশেষত শৌখিন মানুষ যারা দর্শনীয় গরু কুরবানি দেন। জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকেই মিরকাদিম বুট্টি গরু, তাজা গাভীর জন্য এই জনপথ দেশজুড়ে বিখ্যাত ছিল। এ ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় নেপালি, মণ্ডি, হাঁসা, পশ্চিমা ও সিন্ধি জাতের গরু। এক সময় মিরকাদিমের প্রতিটি ঘরে ঘরে এসব বিশেষ জাতের গরু লালন-পালন করা হতো। আগে থেকেই এখানে ছিল বিভিন্ন তেলের মিল, ধান-চালের মিল। সস্তায় খৈল, ভুসি, খুদ, কুড়া ইত্যাদি এখানে পাওয়া যেত। এখন চালের মিল এবং বিভিন্ন কলকারখানা থাকলেও খৈল, ভুসি, কুড়ার দাম অনেকটাই চড়াদামে বিক্রি হচ্ছে। তাই কুরবানিকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজা করার হার এখন অনেকটাই কমে গেছে। এখন শুধুমাত্র পৈতৃক ব্যবসা হিসেবে পেশার মায়ার টানে কয়েকটি পরিবার এই পেশা এখনো ধরে রেখেছে।

এ ছাড়া গৃহস্থ পরিবারগুলোর অনেক সদস্যরা অধিকাংশই বিদেশ চলে যাওয়ায় এবং অন্য পেশায় জড়িত হয়ে পড়ায় কুরবানির গরু বর্তমানে পালন কমে এসেছে। তবে মিরকাদিমে গরুর বিশেষ পালন কৌশলের কারণে এসব গরুর মাংস যেমন সুস্বাদু হয় তেমন চাহিদাও বেশ ভালো। ট্যাবলেট খাইয়ে বা ইনজেকশন দিয়ে কৃত্রিমভাবে এখানকার গরুগুলো স্বাস্থ্যবান করা হয় না। সাধারণত খৈল, ভুসি, খুদ ইত্যাদি খাওয়ানো হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো গরুগুলোর যতœ নেয় গরু পালনকারী মালিকরা নিজেরাই। তাই এর দাম ও চাহিদাও অনেক বেশি। পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জের কুরবানির হাটে মিরকাদিমের এসব গরুর দেখা মেলে। ঈদের দুদিন আগে রহমতগঞ্জের হাটে মিরকাদিমের গরু তোলা হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা ঈদের কয়েক মাস আগেই মিরকাদিমে চলে যান গরু কিনতে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু পছন্দ করে গরু কিনে ফেলেন এবং গৃহস্থদের ঈদ পর্যন্ত গরু পালনের দায়িত্ব ও খরচ দিয়ে আসেন। ফলে কুরবানির হাটে ওঠার আগেই অনেক গরু বিক্রি হয়ে যায়।

তবে এখনো পুরান ঢাকার বৃত্তবান পরিবারগুলোতে মিরকাদিমের গরু কুরবানিকে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য বলে মনে করেন অনেকে। গরু পালনকারীরা জানান, মিরকাদিমের গরুর চাহিদা অনেক। কুরবানি ঈদের কয়েক মাস আগেই তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুকনো, ছোট ও বাছাই করা গরু কিনে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে বাজা গাভী, খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরু আনা হয়। তবে এ গরুগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে এগুলোর বেশির ভাগের গায়ের রঙ সাদা ও নিখাঁদ হয়। এতে প্রতিটি গরুর দাম পড়ে ৮০-৯০ হাজার টাকা। তারপর সেগুলোকে খৈল, ভুসি খাওয়ানো হয়। ধীরে ধীরে কোনো রকম ইনজেকশন, ওষুধ ছাড়াই শুধু খৈল, ভুসি, কুড়া, জাউ খেয়ে গরু হয়ে ওঠে মোটাতাজা। কয়েক মাস লালন-পালনের পর ঈদের আগে প্রতিটি গরু এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেন গৃহস্থরা। বিক্রেতাদের দাবি একটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। যতœ নিতে হয় অনেক বেশি। ফলে এ দামে বিক্রি করেও তেমন লাভবান হওয়া যায় না। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা আমাদের বাপ-দাদার এ ব্যবসায় আছি। মিরকাদিমের গরু খামারিদের আবেদন, সরকার যদি তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিত, তাহলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়া গরু এ ব্যবসায় এগিয়ে নেয়া যেত।

এক সময় সাইজুদ্দিন হাজি, কালা মিয়া হাজি, মোফাজ্জল হোসেন মিরকাদিমের গরু ব্যবসায়ী হিসেবে পুরান ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে রাজত্ব করে গেছেন বলে জানান এলাকাবাসী। এখনো পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠের গরুর হাটে মিরকাদিমের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ এসব গরু। জানা যায়, অন্যান্য অঞ্চলে বুট্টি গরু পাওয়া গেলেও মিরকাদিমের বুট্টি গরুর বৈশিষ্ট্য আলাদা। এর বাহ্যিক অবয়ব খুব তেলতেলে ও গোলাকৃতির হয়। এ ছাড়া নেপালি গরুর উচ্চতা খুবই আকর্ষণীয়। মণ্ডি, সিন্ধি অনেক রঙের হলেও পশ্চিমা আর হাঁসা গরু সাদা রঙের। সাদা এসব গরুর উচ্চতা সবচাইতে বেশি। গরুর হাটের আকর্ষণ বৃদ্ধিতে এসব গরুর চাহিদা বেশ। সিন্ধি গরুর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। সেটাও এখানে পাওয়া যায়।

মিরকাদিম কমলাঘাট বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য আব্দুর রহমান মুন্সী জানান, আমি আগে কুরবানির গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আগে ১৫ থেকে ২০টি গরু পালে তৈরি করতাম। প্রতি বছরই গরুর ব্যবসায় লোকসান গোনার কারণে এই ব্যবসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আফাজউদ্দিন মিয়া জানান, মিরকাদিমের বিশেষ জাতের গরু বিলুপ্তির বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহীদুল ইসলাম শাহিন জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই গরু ব্যবসায়ীরা এখানে গরু লালন পালন করে আসছেন। এক সময় প্রতিটি বাড়িতে গরু পালন করা হতো এখন এটা একেবারে বিলুপ্তির পথে চলে গেছে।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj