সাত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৫ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামে অখ্যাত কোম্পানির সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ও বিসমিল্লাহসহ বিভিন্ন কোম্পানির ঋণ কেলেঙ্কারিতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত জুন শেষে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি সরকারি ৭ ব্যাংক। আলোচ্য ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩১ জুন ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের এক পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মূলধন ঘাটতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলো হলো- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৯ ব্যাংকের মূলধনে বড় অঙ্কের ঘাটতি থাকলেও অনেক ব্যাংকই এ সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে মূলধন পর্যাপ্ত হার হার রেসিও হ্রাস পেয়েছে তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছর সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক, বেসিকসহ বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে। ওই সব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খাতায় মন্দ ঋণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এসব মন্দ ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এটা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে। এর ফলে শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, পুরো অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ঘাটতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেন করতে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে গ্যারান্টি হিসেবে তাদের বাড়তি ফি দিতে হচ্ছে। যার প্রভাবে ব্যবসা ব্যয় বেড়ে গেছে। এ দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও লুটপাটের দায় জনগণের ঘাড়েও চাপানো হচ্ছে। জনগণের করের টাকায় বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগান দিয়ে আসছে সরকার। গত তিন বছরে সরকারি ৬ ব্যাংকের ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৭ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগান দেয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংককে ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। আর বেসিক ব্যাংককে দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ৭ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, অনিয়ম-দুর্নীতির চোরাবালিতে আটকে পড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এরপরও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সাত ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৭৪১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৭১০ কোটি টাকা। এর বাইরে বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩১৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৭ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় খাতের পাঁচ বাণিজ্যিক ও দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। গত প্রান্তিকে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক নতুন করে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। অথচ তিন মাস আগেও এ ব্যাংক দুটির মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, সৎ করদাতাদের টাকা নিয়ে বার বার ব্যাংকের মূলধনের জোগান দেয়া অনৈতিক। কিন্তু মূলধন গ্রাসকারী অসৎ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাত চরম সংকটের মধ্যে থাকলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি গত বাজেটে।

সম্প্রতি ‘রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা : চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় অর্থমন্ত্রী বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততা ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যাংকে যেন লালবাতি না জ্বলে এ জন্য সরকার মূলধনের জোগান দেয়। একটি ব্যাংক খারাপ হলে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হতে হবে। এর আগে অর্থমন্ত্রী সংসদে তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে নানামুখী সংস্কার কার্যক্রমের বিষয় গত বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলাম। ইতোমধ্যে আমরা আর্থিক খাতের আইনি কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনসহ এ খাতের ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটারাইজেশন সিস্টেম চালু করছি। তা ছাড়া রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কোর ব্যাংকিং সল্যুশনের আওতায় আনার কাজও সম্পন্ন করেছি। এ ধারাবাহিকতায় ফিন্যান্স কোম্পানি আইন এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন, বিধি, প্রবিধি ইত্যাদি প্রণয়ন ও সংশোধনের কার্যক্রম চলমান।

সম্প্রতি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা করে একটি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতের মোট ৯ হাজার ৭২০টি শাখার মধ্যে ৫ হাজার ১২০টি শাখা বা ৫৩ শতাংশই সরকারি ব্যাংকগুলোর। ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৩১ ভাগ এবং ঋণের ২২ ভাগ সরকারি ব্যাংকগুলোর। আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রয়েছে ৭ শতাংশ। এর বিশেষায়িত ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক ৩৩ শতাংশ। গত চার বছরে মূলধনের জোগান দিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৯ হাজার ৬৪০ কোটি ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৬৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ২ হাজার ৮০৯ কোটি ৩৪ লাখ, রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ৮০ লাখ ও বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ৮০ কোটি ১১ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। এ সময়ে বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭২৬ কোটি ৮৮ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২৬৯ কোটি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৭৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। আগের প্রান্তিক মার্চে এই তিন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৫১১ কোটি ২৬ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২৮৯ কোটি ৯৩ লাখ ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নানা কারণে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো যাচ্ছে না। তার মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অন্যতম সমস্যা হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। কারণ, একদিকে পরিচালনা পর্ষদে যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের বেশির ভাগই সরকারি দলের সমর্থক। অপরদিকে ঋণ বিতরণে আছে রাজনৈতিক চাপ। রাজনৈতিক তদ্বিরের মাধ্যমে ঋণের চাপ আসে। আবার ওই ঋণ অনুমোদন দেয়া হয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে। ফলে যারা ঋণ নেন, তারাও কোনো না কোনোভাবে সরকারি আদর্শে বিশ্বাসী। এতে যে ঋণ দেয়া হয় তা আর ফেরত আসে না। এভাবেই সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে যাচ্ছে। ওই কর্মকর্তা মনে করেন, রাজনৈতিক চাপ না এলে ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফিরে আসত।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj