দেশীয় ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথা ভারতীয় গরু নিয়ে

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

সীমান্তের কোনো কোনো স্থানে রাতের বেলায় বিজিবির জোরালো নজরদারি না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা

দেব দুলাল মিত্র : আসন্ন কুরবানির ঈদ সামনে রেখে পশুর মূল্যের সব হিসাব-নিকাশ শেষ মুহূর্তে ভারতীয় গরু এসে বদলে দিতে পারে। সীমান্তের বিভিন্ন জেলায় করিডোর খুলে দেয়ায় বৈধ ও অবৈধভাবে হাজার হাজার গরু ঢুকেছে। বিট খাটালগুলোতে এখন গরু ব্যবসায়ী ও ট্রাক চালকদের ফুরসৎ নেই। স্থলপথের পাশাপাশি এবার নৌপথে পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গরু বাংলাদেশে আসছে। পশুরহাটগুলোতে এসব ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশীয় গরুর দাম কয়েকগুণ কমে যাবে। এ কারণে দেশীয় ব্যবসায়ীদের আর্থিক দিক থেকে চরম খতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় গরু এখন দেশীয় গরু ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার বিপুলসংখ্যক ভারতীয় গরু ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে ঢুকেছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর প্রায় সব করিডোর খুলে দেয়া হয়েছে। কুষ্টিয়াতেই ৩১টি করিডোর খুলে দেয়ায় ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক গরু বাংলাদেশে ঢুকেছে। এসব গরু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পশুর হাটে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে সীমান্ত এলাকার বিট খাটালগুলোতে এখনো বিপুলসংখ্যক গরু রয়েছে, আরো আসছে। এগুলো ট্রাকে তুলে সারাদেশের পশুর হাটগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। ভারত থেকে আসা গরু বোঝাই ট্রাকগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিট খাটাল ছেড়ে যাচ্ছে। ঈদের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবে ভারত থেকে গরু আসা অব্যাহত থাকলে দেশীয় গরু ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে পথে বসতে হবে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা এলাকা থেকে রাজধানীতে কুরবানির গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, এবার সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ভারতীয় গরু বাংলাদেশে ঢুকেছে। গত বছর কুরবানির পশুর হাটে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি কম ছিল। এ কারণে দেশীয় গরু ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু এ বছর হাটগুলোতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী সীমান্তের চরমাজারদিয়া বিট খাটালে গত ১০ দিন ধরে নৌপথে গরু আসছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের রঘুনাথপুর বিট খাটালেও নৌপথে গরু আসা অব্যাহত রয়েছে। এসব এলাকায় নৌকায় গরু এনে প্রথমে পদ্মা নদীর চরে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে রঘুনাথপুরসহ বিভিন্ন স্থানে নেয়া হয়।

যশোরের বেনাপোল ও শার্শা সীমান্ত ও সাতক্ষীরার পুটখালি ও অগ্রভুলোট সীমান্তসহ বিভিন্ন স্থান দিয়েও ভারতীয় গরু আসছে। এসব এলাকায় এবার রাতে ও দিনে নৌপথে গরু আনা হচ্ছে। এ সীমান্তের কোনো কোনো স্থানে রাতের বেলায় বিজিবির জোরালো নজরদারি না থাকার সুযোগে চোরাকারবারীরা নদী সাঁতরেও গরু নিয়ে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার পাঁচপোতা, নদীয়ার হাকনাবাড়ি, মালদার পাপুয়াহাট, মুর্শিদাবাদের কৃষ্ণপুর, ধনিরামপুর ও ধূলিয়ান হাট বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশুরহাট। কিছুদিন আগে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশে গরু প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশে গরু আসা অনেক কমে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই অবস্থার পরিবর্তন হলে এখন বাংলাদেশে গরুর পাল ঢুকছে। কুষ্টিয়া সীমান্ত এলাকার লোকজনও বসে নেই। তারাও সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে ভারতীয় গরু নিয়ে আসছে। চোরাইপথে আনা এসব গরু দ্রুত ট্রাকে তুলে স্থানান্তর করছে। বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরাও এ ব্যাপারে স্থানীয়দের সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যশোরের গরু ব্যবসায়ী শাহজাহান মোল্লা জানান, শার্শা ও বেনাপোলে তিন হাজারের বেশি পশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে ১৪/১৫ হাজার গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। এসব ব্যবসায়ী অনেক আশা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে গরু লালন-পালন করে কুরবানির হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। কিন্তু এবার ভারতীয় গরু সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় গরুর কারণে দেশীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পশুর আশানুরূপ মূল্য পাবেন না। কুষ্টিয়া এলাকায় আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ জেলার ৬ উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার খামারি ও গৃহস্থ কুরবানির ঈদের জন্য গরু তৈরি করেছে। কুষ্টিয়ার গরু ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন বলেন, ভারতীয় গরু আসায় আমরা আশঙ্কার মধ্যে রয়েছি। দেশীয় গরুর মূল্য কমে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে সব গরু ব্যবসায়ীকে পথে বসতে হবে।

ওদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও উত্তেজনা থাকলেও কুরবানির ঈদ সামনে রেখে নৌপথে মিয়ানমার থেকে গরু আসা থেমে নেই বলে জানা গেছে। গরু চোরাচালানিরা রাতের আঁধারে মিয়ানমার থেকে ট্রলারে গরু এনে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় নামাচ্ছে। এরপর বিজিবির লোকজনকে ম্যানেজ করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj