ভোগ্যপণ্যের মজুত সিন্ডিকেটের কব্জায়

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

আহসান হাবিব, চট্টগ্রাম অফিস : দেশের বৃহত্তম চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলো অতি মুনাফা লোভি অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা প্রথমে চাল, এরপর পেঁয়াজ, পেঁয়াজের পর এবার কুরবানি ঈদকে সামনে রেখে গরম করার পাঁয়তারা করছে মসলার বাজার। গত কয়েকমাস যাবৎ এসব পাইকারি বাজারে জেলা প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিভাগসহ প্রশাসনের কোনো ধরনের মনিটরিং নেই। ফলে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভোগ্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নানা অজুহাতে একের এক পণ্যের দাম বাড়িয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা, এমনটাই অভিযোগ পাওয়া গেল। অপরদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি নির্ভর ভোগ্যপণ্যের দাম উৎপাদনকারি দেশে বেড়ে গেলে এখানেও দাম বেড়ে যায়। কিন্তু ক্যাব, পাইকারি বাজারের ছোট ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মূলত আমদানিকারক সিন্ডিকেট ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি ভোগ্যপণ্যের বাজার।

সাম্প্রতিককালে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে চাল ও পেঁয়াজের। চালের আমদানি শুল্ক কমানোর পর প্রথমদিকে দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও তেমন প্রভাব পড়েনি চালের দামে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সারাবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা হচ্ছে ২০ থেকে ২২ লাখ টন। আর এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন হচ্ছে কমপক্ষে ১৭ থেকে ১৯ লাখ টন। বাকি ৩ থেকে ৫ লাখ টন পেঁয়াজ আমাদানি করতে হয়। এই পেঁয়াজ নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম ২৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা হয়ে যায়। অধিক পরিমাণ আমদানি ও সামাজিক চাপের মুখে বর্তমানে সেই পেয়াঁজ প্রকারভেদে ২২ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে। তবে পেয়াঁজের দাম কমানো হলেও এবার ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মসলার দাম বাড়িয়েছে এই সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ-পাহাড়তলীসহ চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলো এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই এসব পাইকারি বাজারে জরুরি ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা দরকার বলে মনে করেন তারা।

চলতি মাসের শুরু থেকে বন্যার কারণে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে- এই অজুহাতে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। খাতুনগঞ্জের আড়তদারি প্রতিষ্ঠান ইরা ট্রেডার্সের পরিচালক মোহাম্মদ ফারুক বলেন, আমদানি করা পেঁয়াজের বাজার ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে দাম বেড়ে যাওয়ার পর মিসর থেকে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছেন।

মসলার বাজার গরম : কুরবানির ঈদ সামনে রেখে বাজারে প্রায় সব মসলা পণ্যের দাম বেড়েছে। ইতোমধ্যে দাম বেড়েছে জিরা, এলাচি ও গুলমরিচসহ বেশ কিছু মসলার। প্রতি বছরই কুরবানির ঈদে মসলার চাহিদা বেশি থাকে। এ সুযোগে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী মসলার দাম বাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে মসলার দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ মানছেন না। তারা বলছেন, পাইকারি বাজারে মসলার দাম বাড়েনি।

বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি জিরা গত সপ্তাহের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়, দারুচিনি ৫০ টাকা বেড়ে ৪০০ টাকা ও এলাচি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয় ১৫০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকা, তেজপাতা ২০০ টাকা, লবঙ্গ ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, কিচমিচ ৪০০ টাকা, জয়ফল ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা, যত্রিক ১৫০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা, আলু বোখারা ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। মসলার দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতা আবদুল মোমিন বলেন, কুরবানির ঈদের আগে পাইকারি বাজারে মসলার দাম বেড়েছে। আমরা খুচরা ব্যবসায়ী, বেশি দামে কিনলে বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেন, মসলার আমদানি বেশি হওয়ায় তেমন দাম বাড়েনি। অনেক খুচরা ব্যবসায়ী দ্বিগুণ লাভ করছেন। তারা যদি দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় আমাদের কিছু করার নেই।

কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন ভোরের কাগজকে বলেন, আমদানিকারক ও খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের যথাযথ মনিটরিং, টিসিবিকে দ্রুত কার্যকর, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাজার মনিটরিং জোরদার করার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে তৎপর করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্ব দেন।

তবে খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগির আহমেদ বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, এসব সংবাদ প্রতিদিন ঢাকা থেকে করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকেও যদি এরকম করা হয় তাহলে এখানে ব্যবসা থাকবে না। এখানে সিন্ডিকেট করার কোনো সুযোগ নেই। সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করছেন খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী এহছান উল্লাহ। তিনি বলেন, কুরবানি ঈদে ব্যবহৃত বিভিন্ন মসলার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে- যা আমদানি নির্ভর, সিন্ডিকেট নয়। বাজেটে মসলা আমদানির শুল্ক বাড়ানোর ফলে জিরা, গোলমরিচ, এলাচিসহ বেশ কিছু মসলার দাম বেড়েছে। ঈদে চাহিদা বেশি থাকায় দাম কিছুটা বাড়তি থাকে।

চাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর পরও বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি : চাল আমদানিতে ১৮ শতাংশ শুল্ক কমানোর পর সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি বেড়ে গেলেও এর প্রভাব তেমন একটা পড়েনি পাইকারি ও খুচরা বাজারে। কারণ মোট চালের আমদানি হওয়ায় কিছুটা দাম কমেছে মোট চালের। তবে দেশীয় চিকন চালের দাম পড়েনি। এখানেও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালের দাম কমতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ গুদামে পর্যাপ্ত চাল থাকার পরও অল্প অল্প করে দেশীয় চাল বিক্রি করছেন বলেন অভিযোগ করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। যার কারণে দেশীয় চালের দাম কমছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাক্তাইয়ের এক ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি বছরের এপ্রিলে চালের বাজারে দাম বাড়তে থাকে। সে সময় আড়তদার ও উত্তরবঙ্গের মিল মালিকরা পরিবহন খরচ ও বন্যার অজুহাতে দাম বাড়ায়। কিন্তু পরিবহন খরচ বাড়তি হলেও কেজিতে ৩-৪ টাকার বেশি হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু চাক্তাই-পাহাড়তলী পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা কেজিতে ১২-১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। আসলে চট্টগ্রামে চালের বাজার না পড়ার পেছনে মজুত করে রাখার বিষয়টিকে কারণ হিসেবে দেখছেন এ ব্যবসায়ী। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তিনি এও বলেন, এখনো যদি চাক্তাই-পাহাড়তলীর চালের আড়তগুলোতে অভিযান চালানো হয়, তাহলে প্রত্যেকটি আড়তে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার করে চালের বস্তা পাওয়া যাবে। কোনো কোনো আড়তে ৩ থেকে ৪ হাজার বস্তাও পাওয়া যাবে। তার এ অভিযোগটি অনেকটা সত্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিছুদিন আগে চাক্তাইয়ের ৬টি আড়ত ও ৩টি চাল মিল আগুনে পুড়ে যায়। সে সময় এসব আড়ত ও মিল মালিকদের দেয়া তথ্যমতে পুড়ে যাওয়া গুদামগুলোতে প্রায় ২০-২২ হাজার বস্তা চাল ছিল। শুধুমাত্র চাক্তাইয়ে ৩শর অধিক চালের আড়ত ও মিল আছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতেও একই সংখ্যক চালের আড়ত আছে। সেই হিসেবে বর্তমানে কি পরিমাণ চাল চাক্তাই ও পাহাড়তলীতে মজুত আছে তা অনুমান করা যায়।

চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও মেসার্স আলম এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. এনামুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, এখানকার বাজারে একদম প্রভাব পড়েনি তা কিন্তু নয়। হয়তো বেশি পড়েনি। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট শব্দটা আমি বিশ্বাস করি না। আর ধান-চালের বাজারে সিন্ডিকেট করে বাজার আপ-ডাউন করার সুযোগ নেই। তবে আমাদের এখানে চাল আসে উত্তর বঙ্গ থেকে। সেখানে কয়েকশ মিল আছে। তারা মজুত করছে কিনা সে বিষয়ে আমার জানা নেই। চালের বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪২-৪৪ টাকা, যা আমদানির চাল আসার আগে বিক্রি হতো ৪৩-৪৬ টাকা। মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ৫০-৫১ ও ৫৩-৫৪ টাকায়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj