সশস্ত্র যুদ্ধের পথে রাখাইন! : নারী-শিশু বাংলাদেশে পাঠিয়ে লড়ছেন রোহিঙ্গা পুরুষরা

বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

কৈলাস সরকার, উলুবুনিয়া ও উখিয়া (কক্সবাজার সীমান্ত) থেকে : নাসিমা খাতুন তার আট ছেলে এক মেয়ের মধ্যে ছোট তিন ছেলে আর বড় ছেলের বৌকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন মিয়ানমারের রাখাইন থেকে। তার বড় পাঁচ ছেলে সে দেশে রয়ে গেছে সেনা-পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। আর এক মেয়ে এবং মেয়ের স্বামীসহ কোথায় কিভাবে আছে জানা নেই তার।

গত রোববার রাতে নাসিমা তার স্বামী নূরুল আলমসহ পাঁচ থেকে ১৩ বছর বয়সী তিন ছেলে এবং বড় ছেলের বৌসহ তাদের কদুরা গ্রাম ছেড়ে পালান। তারা সীমান্তের উলুবুনিয়া পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তার পাঁচ ছেলে নূর কামাল (২৮), নূর বশর (২২), শহীদুল বশর (২২), রবিউল বশর (২০) এবং নূর কদর (১৮) কোথায় কিভাবে আছে তাও তার জানা নেই। শুধু এটুকু জানে তারা যুদ্ধে আছে।

বাংলাদেশে এসে নাসিমা তার পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে সীমান্তবর্র্তী টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নের উলুবুনিয়া গ্রামে খোরশেদ আলমের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার স্বামী নূর আলম বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন তাদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য।

প্রচণ্ড ক্ষোভ আর আবেগ নিয়ে এ প্রতিবেদককে নাসিমা তার কষ্টের কথা জানান। তিনি জানান, সেনা বাহিনীর সদস্যরা গত রোববার তাদের যখন ধাওয়া করে, তারা তখন দৌড়ে পালাচ্ছিল। এ সময় তার দুই খালাত ভাই গোরা মিয়া এবং শাহাবুল আলমকে গুলি করে হত্যা করে তাদের সামনে।

নিজের পাঁচ ছেলে নিখোঁজ রয়েছে লড়াই করার জন্য, সেজন্য নাসিমার মনে কোনো দুঃখ। তিনি বলেন, সেনা বাহিনীর লোকজন যখন যা ইচ্ছা তাই করে। যে ভাবে ইচ্ছা, সে ভাবে নির্যাতন চালায়। ঘরে বা বাড়িতে যে কোনো জিনিস পছন্দ হলে নিয়ে যায়, কিছু বলার সাহস নাই কারো। আমার এক মাত্র মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম শুধু সেনা সদস্যদের ভয়ে। কারণ, তারা যেকোনো সময় তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।

নাসিমা জানান, তার পাঁচ ছেলের মতো অনেক পরিবারই মহিলা ও শিশু সদস্যদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষরা লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে।

তিনি বিভিন্ন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন, তাদের কদুরা গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি লুট করা হয়েছে। সব কিছু জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। তার ঘরবাড়ির অবস্থা কেমন তা কিছুই জানেন না নাসিমা।

রোহিঙ্গা যুবক নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় উলুবুনিয়া সীমান্তের কাছে। তিনি জানান, মিয়ানমার সেনা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে মাইন পুঁতে রেখেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর একটার দিকে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়ে তিন জন রোহিঙ্গা মারা গেছে এবং আরো তিন জন আহত হয়েছে। নাজিম উদ্দিন নিজেও একজন যোদ্ধা বলে জানায় এবং বলে, তাদের কাছে তেমন কোনো যুদ্ধাস্ত্র নাই। হাত বোমা এবং ধারালো অস্ত্রই তাদের ভরসা। তবে তাতে তারা ভীত নয়।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্য বর্তমানে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। সহিংসতা বর্তমানে বিপ্লবে রূপ নিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বিদ্রোহীদের মধ্যে কে মরবে কে বাঁচবে এখন আর কেউ সে পরোয়া করে না। গত ২৫ আগস্ট রাতে বিদ্রোহী রোহিঙ্গারা ৩০টি পুলিশ চৌকিতে হামলা চালানোর পর থেকে অব্যাহত এ সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১০৪ জনে। নিহতদের মধ্যে ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন।

রয়টার্স জানায়, রোববার রাখাইনের উত্তরাঞ্চলজুড়ে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষে কয়েকশত রোহিঙ্গা বিদ্রোহী অংশ নিয়েছে বলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে। এ হামলার দায় স্বীকার করা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (এআরএসএ) সন্ত্রাসী সংগঠন বলে ঘোষণা করেছে মিয়ানমার সরকার। কিন্তু গতকালের এক বিবৃতিতে এআরএসএ বলেছে- তারা সন্ত্রাসী নয়, তারা রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষার জন্য হামলা চালিয়েছে।

এর আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে পুলিশের একটি চৌকিতে একই ধরনের হামলা চালায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। তার পর থেকে ওই এলাকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমনমূলক সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ফলে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

এবারের ঘটনার পরও প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা, যাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী, রাখাইন থেকে পালিয়ে নাফ নদী ও স্থল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj