বিক্ষোভে অচল পাকিস্তান : জয়নবের ঘাতক ধরা পড়েনি এখনো

রবিবার, ১৪ জানুয়ারি ২০১৮

কাগজ ডেস্ক : পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টিকারী জয়নব ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করেছেন পাকিস্তানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা। তার মতে, কাসুর জেলায় শিশু ধর্ষণ প্রায় স্বাভাবিক এক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর আগে সেখানে যাদের ধর্ষণ করা হয় তারা ছিল অরাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে জয়নবের পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক পার্টি (পিএটি) এবং তেহরিক-ই-লাব্বাইক ইয়া রসুল আল্লাহ পার্টির (টিএলওয়াই) সক্রিয় সদস্য। এ দুটি দলই বর্তমানে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) এর বিরোধী। এ দুটি দলই গত বছর নভেম্বরে টানা ১৫২ দিনের জন্য রাজধানী ইসলামাবাদ অবরোধ করে রাখে পিএটি। ওই ঘটনার পর দেশটির সামরিক নেতৃত্বের পরামর্শে পদত্যাগে বাধ্য হন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী জায়েদ হামিদ। খবর ট্রিবিউন, ডন, জিওনিউজ।

এদিকে, নিমর্ম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া জয়নব তার নোটবুকের পাতায় ৪ জানুয়ারি শেষবারের মতো নিজের সম্পর্কে লিখেছিল জয়নব, আমি একটি মেয়ে। আমার নাম জয়নব। আমার পিতার নাম আমিন। আমার বয়স সাত বছর। আমার বাড়ি কাসুর। তার জানা ছিল না, এই লেখাই হবে তার শেষ লেখা। ভাবতে পারেনি, মানুষরূপী পশুর হাতে পড়ে নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হতে যাচ্ছে তার এ জীবন। অথচ ঠিক তাই ঘটেছে ছোট্ট জয়নবের জীবনে। পাশবিক উপায়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে তাকে। লাশ ছুড়ে ফেলা হয়েছে পরিত্যক্ত আঁস্তাকুড়েতে। এর আগে পাঁচদিন ধরে নিখোঁজ ছিল সে। গত ৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার বাড়ির অদূরে আবর্জনার স্ত‚প থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যায়, লাশ উদ্ধারের ২/৩ দিন আগেই হত্যা করা হয়েছে তাকে। এদিকে, জয়নবের মর্মান্তিক পরিণতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই অপরাধীকে গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পাকিস্তান। চারদিন ধরে চলে আসা বিক্ষোভে অচল হয়ে গেছে পাঞ্জাব প্রদেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

বিক্ষুব্ধ জনতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ভাঙচুর করে। রাস্তায় থাকা যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে। সংসদ সদস্যদের বাসভবনে হামলা চালায় এবং ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের অফিসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে দুই বিক্ষোভকারী নিহত এবং আরো ছয়জন আহত হয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে এক পর্যায়ে আধাসামরিক বাহিনীকে তলব করতে বাধ্য হয় সরকার। এদিকে, দেশব্যাপী বিক্ষোভ-আন্দোলনের পরও জয়নবের খুনিকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। ইতোমধ্যে একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে সামাজিক নেটওয়ার্ক ও গণমাধ্যমে, যেখানে একজন লোককে দেখা যাচ্ছে জয়নবের হাত ধরে তাকে রাস্তা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে।

উল্লেখ্য, শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে আগে থেকেই কুখ্যাতির শীর্ষে রয়েছে পাঞ্জাবের কাসুর জেলা। ২০১৫ সালে সেখানে বেশ কয়েকজন অপরাধীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে একটি ভয়ঙ্কর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত যাদের কাজ ছিল নিয়মিত শিশুদের ধর্ষণ করা এবং তাদের ব্লু্যাকমেইল সেক্সভিডিও তৈরি করা। ২০১৫ সালে কেবল কাসুর জেলাতেই দুই শতাধিক শিশুর সেক্সভিডিও তৈরি করের পর সেগুলো চড়া দামে বিক্রি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক কালোবাজারে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির সুযোগে শিশু ধর্ষণ প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানে। প্রতিদিন গড়ে ১১ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয় দেশটিতে। ২০১৬ সালে দেশটিতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৪,১৩৯টি শিশু; যার মধ্যে ২,৪১০টি মেয়েশিশু এবং ১,৭২৯টি ছেলেশিশু। এদের সবাইকেই হয় অপহরণ, ধর্ষণ, দল বেঁধে ধর্ষণ অথবা পায়ুর্ধষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাত্র ২ বর্গমাইল আয়তনের কাসুরে জয়নবের র্ধষণ ও হত্যার ঘটনাটি একাদিক্রমে শিশু নিপীড়নের ১২ নম্বর ঘটনা। এর আগে সেখানে অনুরূপ ধর্ষণশেষে নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে আরো ১১টি মেয়ে। হামলাকারীদের হাত থেকে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছে মাত্র একজন।

শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে জানান, অপরাধীদের সম্পর্কে সবচেয়ে ভয়াবহ যে ঘটনাটি জানা গেছে তা হচ্ছে, ইদানিং এসব অপরাধী গ্রুপের ওপর রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদ আরো বেড়েছে। এ সুযোগে দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ ও সেক্সভিডিও তৈরির হিড়িক পড়ে গেছে তাদের মধ্যে। গত বছর একাধিক অভিযানে এ ধরনের হাজার হাজার ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদিকে, পাঞ্জাব সরকারের মুখপাত্র মালিক আহমেদ খান গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন, ইতোপূর্বেকার ধর্ষণ ও হত্যার সবগুলো ঘটনার সঙ্গে জয়নবের ঘটনাটিও একসূত্রে গাঁথা বলে ধারণা করছি আমরা। এগুলো কোনো একজন সিরিয়াল কিলারের কাজ হতে পারে। ডিএনএ টেস্টেও এর আগে অনুরূপ সাতটি হত্যার ঘটনার নেপথ্যে থাকা অপরাধীর সঙ্গে আলামতের মিল খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখুনি তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।

এদিকে, জয়নবের ঘাতকের গ্রেপ্তার দাবিতে চলমানে আন্দোলনে প্রায় অচল হয়ে আছে সারা দেশ। প্রথম দিকে এক পর্যায়ে বিক্ষোভটি সহিংস রূপ নিলেও পরবর্তী সময়ে শান্তিপূর্ণভাবেই বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন বিক্ষোভকারীরা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পয়েন্টে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর গাফিলতির বিরুদ্ধে নিজেদের তীব্র ক্ষোভ তুলে ধরছেন সর্বস্তরের মানুষ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj