প্রভাবশালীদের অর্থ পাচার রুখতে নেই কঠোর ব্যবস্থা : অর্থ ফেরাতে দুদকের উদ্যোগ

রবিবার, ১৪ জানুয়ারি ২০১৮

এস এম মিজান : প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে। এ নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কার কথা বললেও অর্থ পাচার প্রতিরোধে কঠিন বা কঠোর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শুরু হলেও অপরাধীরা সমাজের প্রভাবশালী হওয়ায় একটি পর্যায়ে গিয়ে তা থেমে যাচ্ছে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো এবং অন্য একজনের টাকা ফিরিয়ে আনাই এখনো উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

সূত্র জানায়, পাচার করা অর্থ ফেরত আনার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডি কাজ করছে। কিন্তু এ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যে কারণে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তবে এবার এককভাবে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ক্ষেত্রে কমিশনের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশে অবস্থানরত দেশীয় দূতাবাসগুলোকে দুদককে সহযোগিতা করতে জরুরি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কারণ, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ পেয়েছে দুদক।

ওসব দেশে অর্থ পাচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে দুদকের তদন্ত টিম সেখানে যাবে। ওই টিমের সফরের আগেই বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের সে দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুদককে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মরত দূতাবাসগুলোতে জরুরি নির্দেশনাসহ চিঠি পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে ওই ব্যক্তিদের তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নাও দিতে পারে। ওই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি মিশনগুলো দুদকের তদন্ত দলকে সহায়তা করবে। তা ছাড়া জাতিসংঘের কনভেনশন এগেইনস্ট করাপশনের আওতায়ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার সুযোগ রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই বিষয়ে দুদকসহ সরকারকে সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা একটি জটিল প্রক্রিয়া। ফলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কোনো সফলতা আসছে না। বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে বেশ কিছু অর্থ পাচারের ঘটনা ধরা পড়লেও ফেরত আনার বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই। এ ক্ষেত্রে ২০১২ এবং ২০১৩ সালে তিন দফায় সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে থাকা খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ২১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত আনতে পেরেছিল দুদক। এ ছাড়া আরো একজনের টাকা দুদক দেশে ফেরাতে পেরেছে। কোকোর নাম নিশ্চিত করলেও দ্বিতীয় ওই ব্যক্তির নাম জানাতে পারেননি দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে দুদকের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

দুদকে মামলা-তদন্ত চলছে যাদের বিরুদ্ধে : ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। যুক্তরাজ্যের লয়েড টিএসবি অফশোর প্রাইভেট ব্যাংকে বাংলাদেশি ৯ কোটি ৫৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮১ টাকা সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া গেছে। আদালতে খন্দকার মোশাররফের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাদের মক্কেল এই টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশি কোনো নাগরিককে বিদেশে কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু সেই অনুমতি খন্দকার মোশাররফের ছিল না। তিনি এই টাকা পাচার করেছেন বলেই দুদকের তদন্তে বের হয়ে এসেছে। ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর এ মামলার বিচার শুরু হয়েছে। তবে এখনো তা শেষ হয়নি।

মোশাররফ ছাড়াও রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারকসহ দেশের প্রভাবশালী বেশ কিছু ব্যক্তির বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে দুদকের হাতে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যেমন সম্পৃক্ত, কেউ কেউ আবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানও করছে সংস্থাটি। দুদক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় তিন হাজার ৬৫৬ বাংলাদেশি অবৈধভাবে অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোমের সুবিধা নিয়েছে। এ তালিকার মধ্যে সাবেক দুজন সংসদ সদস্য, সাবেক এক বিচারক, সাবেক এক সচিব, বর্তমান সরকারের এক মন্ত্রীর ছেলে, গাড়ি আমদানিকারকদের সমিতি বারভিডার সাবেক এক চেয়ারম্যান, চাঁদপুর জেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এক নেতা, বিএনপির সাবেক এক মন্ত্রী, সাবেক এক অর্থমন্ত্রীর ছেলে, ফেনীতে সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য, বিএনপির বাগেরহাটের সাবেক এক সংসদ সদস্য, বেসিক ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার নাম রয়েছে।

পানামা ও প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে ‘জড়িতদের’ বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান করছে দুদক : সম্প্রতি অর্থপাচার নিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে দুটি তথ্য। এর একটি পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি এবং অপরটি প্যারাডাইজ পেপারস কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। দুটি তালিকাতেই বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির নাম এসেছে। ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল বিদেশে অবৈধভাবে বিনিয়োগকারীদের একটি তালিকা প্রকাশ হয়। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি নামে পরিচিতি পাওয়া এ তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান, প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীদের নাম ছিল। এই তালিকায় নাম ছিল ১১ বাংলাদেশির। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে ২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল দুদকের উপপরিচালক আখতার হামিদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। ওই বছরের ২ মে পানামা পেপারসে নাম আসা ১১ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে দুদক।

এদের মধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে সংস্থাটি। কিন্তু দুদকের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মামলা বা অন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এর রেশ কাটতে না কাটতেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, রাজনীতিকের নাম প্রকাশ হয়েছে একই ধরনের বিনিয়োগের বিষয়ে। এই তালিকাটি প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এরা সবাই নিজ দেশে কর ফাঁকি দেয়ার জন্য, কর দিতে হয় না বা দিলেও খুবই স্বল্প হারে দিতে হয় এমন দেশে (ট্যাক্স হ্যাভেন) অর্থ বিনিয়োগ করে রেখেছেন। এই তালিকায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু, তার স্ত্রী ফাতিমা আউয়াল এবং তিন ছেলে তাবিথ আউয়াল, তাফসির আউয়াল ও তাজওয়ার মোহাম্মদ আউয়ালেরও নাম আছে।

দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আইনানুগ প্রক্রিয়ায় যাতে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আনা যায়, সে জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ ছাড়া এনবিআর এবং দুদককেরও উদ্যোগ নিতে হবে।

পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যক্তি ও কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসায় উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গত ২১ নভেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসে বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, সে বিষয়ে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে জড়িতদের অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দুর্নীতি সহায়ক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মূলত কর ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যেই দেশের বাইরে নামে-বেনামে ব্যাপক অর্থ পাচার করা হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব গগনচুম্বী। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে, এমন অর্থ পাচার বন্ধে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj