উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে আ.লীগ কৌশলে মাঠ গোছাচ্ছে বিএনপি

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বছরের শেষপ্রান্তে জাতীয় নির্বাচন। এরই মধ্যে সারা দেশে বইছে ভোটের হাওয়া। দলগুলোতে প্রস্তুতির তোড়জোড়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ তুঙ্গে। নির্বাচনী এলাকায় ঘন ঘন ছুটছেন বিভিন্ন দলের হেভিওয়েট নেতারাও। কেমন তাদের প্রস্তুতি, মাঠের অবস্থাইবা কি? এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন

এম ফিরোজ মিয়া, কুমিল্লা থেকে : কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১ সংসদীয় আসন। আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনে বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতারা। তবে নীরব থেকে কৌশলে মাঠ গোছাচ্ছে বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা অনেকটাই তৎপর এ আসনে। এসব নেতা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে তাদের প্রার্থিতা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি জানান দিচ্ছেন।

১৯৭৩ সালের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এ আসনে জয়ের মুখ দেখেনি। প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ এ আসনে জাসদ, স্বতন্ত্র ও জাতীয় পার্টি প্রার্থী হিসেবে ৪ বার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিসহ ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং আগামী নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য একক প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন টানা ৪ বার এ আসনের এমপি ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া বিএনপির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে পরাজিত করে ৩৫ বছর পর এ আসনটি উদ্ধার করেন এবং ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে তিনি নৌকার প্রার্থী হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। এমপি সুবিদ আলী ভূঁইয়া বলেন, বিগত ৯ বছরে আমি দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। আমার একান্ত প্রচেষ্টায় দুই উপজেলায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। মেঘনা উপজেলার আমূল পরিবর্তনে আমি ব্যাপক উন্নয়ন করেছি এবং আরো বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এ উপজেলায় এডিবির অর্থায়নে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাটেরচর-ওমরাকান্দা ১২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করেছি। এতে রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে মেঘনা উপজেলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়েছে। দাউদকান্দি উপজেলার প্রতিটি গ্রামের ছোট ছোট রাস্তাগুলোকে মূল সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।

নিজ উদ্যোগে উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৮ বিঘা জমির ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন শিশুপার্ক, ঐতিহাসিক কুতুব মিনারের আদলে এতদাঞ্চলের বৃহৎ ঈদগা গেট, মাঠ, মেহরাব নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ৪২ ফুট উচ্চতার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছি। দুই উপজেলার মানুষকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার জুরানপুর এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি, ডাকঘর, ব্যাংক, হাসপাতাল, বাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, স্টেডিয়াম, কবরস্থানসহ ৪০টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছি। এ আসনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আমার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তিনি গত ৯ বছরের উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আসছে নির্বাচনে নৌকার পক্ষে ভোট চাইছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সুবিদ আলী ভূঁইয়ার মনোনয়ন অনেকটা চূড়ান্ত এমন খবর সংসদীয় আসন এলাকায় বিরাজ করলেও এ দল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে দৌড়ঝাঁপ করছেন দলের আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী। তিনি এ আসনের মেঘনা উপজেলার রূপকার হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত ও উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি এবং ওই উপজেলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান মো. শফিকুল আলম। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। দলে তার মজবুত অবস্থান রয়েছে। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, জেলার চরাঞ্চল হিসেবে খ্যাত দুর্গম ও অবহেলিত মেঘনা উপজেলায় ক্লিন ইমেজের এ নেতার হাত ধরে সর্বত্র লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া এবং এখানে তার নেতৃত্বে দলের শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, মেঘনার উন্নয়ন নিয়েই তার রাজনীতি, তাই দলমত নির্বিশেষে সবার কাছেই তিনি প্রিয় সফিক ভাই। অধিকাংশ সময় তিনি এলাকায় অবস্থান করে ঘুরে বেড়ান মেঘনার একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত। এ দ্বীপ উপজেলাবাসী সফিকুল আলমকে প্রথম এমপি হিসেবে দেখার স্বপ্ন দেখে। আগামী সংসদ নির্বাচনে দল তাকে মূল্যায়ন করবে এমনটাই প্রত্যাশা করে সর্বস্তরের মেঘনাবাসী। এ ছাড়া কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আব্দুল মান্নান এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে প্রচারণা রয়েছে। আসছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি মাঠে কাজ করছেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এদিকে বেশ কিছু কারণে আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি কিন্তু ঐক্যবদ্ধ। হামলা-মামলা, জেল-জুলুমসহ নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এ আসনে বিএনপি তাদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এখানে বিএনপির সম্ভাব্য একক প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন নানা কৌশলে মাঠ গুছিয়ে আরো আগে থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। প্রতি সপ্তাহে তিনি এলাকায় এসে সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। আসছে নির্বাচনে এ আসনটি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তিনি জোরালোভাবে কাজ করছেন এবং নেতাকর্মীদের নানা দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ উপজেলায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনসহ কৌশলে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ড. মোশারফের অনুসারীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী যত শক্তিশালীই হোক না কেন আগামী নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে তার কোনো অন্তরায় হবে না। অপরদিকে এ আসনে জাতীয় পার্টি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের মজবুত অবস্থান করে নিয়েছে। এখানে এ দলের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় ছাত্রসমাজের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মো. ইফতেখার আহসান হাসান জোটের মনোনয়ন পেতে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপসহ গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দলের চেয়ারম্যান পল্লী বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদারসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে আমি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ আসনের প্রতিটি এলাকায় বিচরণ করে নেতাকর্মীদের নিয়ে ধীরে ধীরে দলের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছি। সদা হাস্যোজ্জ্বল এ ছাত্রনেতা ইতোপূর্বে দলের এবং এলাকার সাধারণ লোকজনের দৃষ্টি কেড়েছেন। উপজেলা সদরের তুজারভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা হাসান ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্লিন ইমেজকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় জাতীয় পার্টির অবস্থান মজবুত করেছেন বলে জানিয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। তার প্রচেষ্টায় এ উপজেলায় দলের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এ আসন থেকে ক্লিন ইমেজের নেতা হাসানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগসহ সব ক্ষেত্রে কাজ করছেন। এ ছাড়া এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে আবু জায়েদ আল মাহমুদ (মাখন সরকার) দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ ও এলাকায় গণসংযোগ করছেন।

সংশোধনী : ভোরের কাগজে গত ১২ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী-১ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের ২ হেভিওয়েট আফজাল ও শাহজাহান মিয়া শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আফজাল হোসেনকে বর্তমান এমপি উল্লেখ করা হয়েছে। আসলে ওই আসনে বর্তমান এমপি হলেন মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। এ অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমরা দুঃখিত। বিস।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj