একুশের অনালোচিত ও নেপথ্য কথা

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আমাদের ভাষাসংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। এই ইতিহাসের অনেক ঘটনা আজও অজানা ও অনালোচিত। ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ভাষাসংগ্রামের অজানা ও অনালোচিত বিষয়াবলী উৎসাহী পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করছেন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুব।

প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন

একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারের জঙ্গি নীতিতে পুলিশের গুলিতে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ছাদে উত্তোলন করা হয় প্রতিবাদী কালো পতাকা। এই কালো পতাকা উত্তোলনের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ সুলতান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

‘২২ তারিখ ভোরবেলা ঢাকার রেলওয়ে লোকো শেডে ধর্মঘট সফল করার দায়িত্বে আমি নিয়োজিত ছিলাম। একটি গাড়ি সেদিন ঢাকা স্টেশন থেকে ছাড়েনি। একটি বাস চলাচল করেনি ঢাকার রাস্তায়। একটি রিকশাও কেউ দেখেনি। কোনো কর্মচারী অফিসে যান নাই। রেডিও বন্ধ ছিল সেদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষে প্রথম কালো পতাকা উড্ডীন হলো সকাল আটটায়। আমি আজ গর্বিত যে সেই কালো পতাকা আমরা চারজন উত্তোলন করেছিলাম।’ (সূত্র : একুশের সংকলন ৮০, স্মৃতিচারণ, বাংলা একাডেমি ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮০)

এটাই ছিল একুশের শহীদদের স্মরণে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন। মুর্তজা বশীর লেখকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, কালো পতাকা উত্তোলনকারী অপর দুজন ভাষাসংগ্রামী হলেন হাসান হাফিজুর রহমান ও মুর্তজা বশীর।

উপেক্ষিত ভাষাশহীদ সিরাজুদ্দিন

১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিরাজুদ্দিন নবাবপুরে ‘নিশাত’ সিনেমা হলের বিপরীত দিকে মিছিলে থাকা অবস্থায় টহলরত ইপিআর জওয়ানের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। মিছিলে তার সহযাত্রী কলতাবাজারের সেরাজুদ্দিন ওরফে নান্না মিয়ার সাক্ষ্যে জানা যায়, তার আবাসস্থান ছিল বাসাবাড়ি লেন, তাঁতিবাজার। দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনেও উল্লিখিত স্থানে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর রয়েছে। এ সম্পর্কে এর বেশি কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে ভাষাশহীদ সিরাজুদ্দিনের তথ্য উদঘাটন করার ব্যাপারে ভাষাসংগ্রামী, লেখক ও গবেষক আহমদ রফিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সংগৃহীত গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ১৯৭৫ সালের দৈনিক বাংলা পত্রিকার একুশে সংখ্যায় ‘ইতিহাস : মিছিলে হারানো নাম’ শিরোনাম একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। ওই প্রবন্ধে সিরাজুদ্দিন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। তাছাড়াও আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে (পৃ. ১৯৭) বলেন, ‘কলতাবাজার মহল্লার অধিবাসী সেরাজুদ্দিন ওরফে নান্না মিয়া একাধিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করেছেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। তিনি ১৯৭২ সালে (তিনি তখন স্টেডিয়ামে দোকান-ব্যবসা চালান) এক সাক্ষাৎকারে লেখককে জানান যে, তিনি বাবুবাজার থেকেই চলমান মিছিলে অংশ নিয়ে সদরঘাটে রাস্তার মোড়ে পৌঁছান। সেখান থেকে ভিক্টোরিয়া (বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে রথখোলায় পৌঁছাতেই দেখেন চকচকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকজন জওয়ান ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে। তা সত্ত্বেও মিছিল ¯েøাগানে রাজপথ মুখরিত করে এগিয়ে চলে।

সেরাজুদ্দিন মিছিলে চলতে চলতে দেখতে পান উল্টো দিক থেকে সৈন্য বোঝাই একটি ট্রাক ‘চৌধুরী সাইকেল মার্ট, বরাবর এসে থেমে যায়। এদিকে ‘মানসী’ সিনেমা হলের গলি থেকে পুলিশ ও জওয়ানদের একটি অংশ গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। তখনই ট্রাক থেকে গুলি ছুটে আসে মিছিল লক্ষ্য করে। তার কিছু দূরে একজন তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। শার্ট-প্যান্ট পরা ওই তরুণের কোমরের ওপর গুলি লাগে। রক্তে কাপড় ভিজে যায়। ওই মিছিলের কয়েকজন তাকে ধরাধরি করে ‘মানসী’র গলিপথে নিয়ে বলে যায় তরুণেরও নাম সিরাজুদ্দিন, ঠিকানা বাসাবাড়ি লেন, তাঁতিবাজার। সেরাজুদ্দিন এরপর গুলিতে লাঠিচার্জে ছত্রভঙ্গ মিছিলের একাংশের সঙ্গে ‘মানসী’র গলিপথ ধরে বংশালের দিকে চলে যায়। নবাবপুর রোড ধরে চলতে ভরসা পাননি তিনি। সেরাজুদ্দিন আরো জানান, মিছিল থেকেই তিনি দেখেছেন নবাবপুরে ‘স্টুডিও এইচ’-এর সামনে গুলিতে একজনকে আহত হতে। সেখানে রাস্তায় দাঁড়ানো লাইটপোস্টে বুলেটের ক্ষতচিহ্ন বহুদিন ছিল। নবাবপুর দিয়ে পরবর্তীকালে আসা যাওয়ার পথে বুলেটের সেই চিহ্ন তাকে বহুদিন ২২ ফেব্রুয়ারির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। অরাজনৈতিক এই যুবা নিছক একুশ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণ ও আবেগের টানে পরদিনের মিছিলে শামিল হন।’ সেরাজুদ্দিন ওরফে নান্না মিয়া ছিলেন ভাষাশহীদ সিরাজুদ্দিনের মৃত্যু দৃশ্য প্রত্যক্ষকারী একমাত্র সাক্ষী। ভাষা সংগ্রামী লেখক ও গবেষক আহমদ রফিক ১৯৭২ সালে নান্না মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে ভাষাশহীদ সেরাজুদ্দিন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আহমদ রফিক ‘ইতিহাস : মিছিলে হারানো নাম’ শিরোনাম একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেটি ১৯৭৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরা হলো : ‘….বাইশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) শানিত জল্লাদ দিনটি বাস্তবিকই ছিলো কল-গর্জন-মুখর। বিশাল ধনুকের ছিলার মতো টান টান। ইস্পাতের ঝলসানি নিয়ে নিষ্ঠুর রোদ সকাল থেকেই হেঁটে বেড়াচ্ছিল কালো পিচের ওপর। সামরিক বাহিনী মোতায়েন, ১৪৪ ধারা, কারফিউ ইত্যাদি কিছুই যেন শহরটিকে স্পর্শ করছে না। স্বতঃস্ফূর্ত জলপ্রপাতের মতো মানুষ সবকিছু অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়েছে। সে দিনের ঢাকা ছিলো মিছিলের শহর। মিছিলে ভেসে নিজের অজান্তেই সদরঘাট বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছে যায় নান্না। ঘোর লাগে তার চোখে। ছোট্ট একটি দলের সঙ্গে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। রায়সাহেব বাজারের পুলের একপাশে দাঁড়িয়ে চারদিকটা একবার দেখে নেয়। একটু এগোয় সে, রথখোলার মোড়ে ট্রাক ভর্তি সামরিক বাহিনীর জওয়ান সশস্ত্র, উদ্ধত, যেন কারো প্রতীক্ষায় তৈরি, পেছন ফেরে সে। মিছিল আসছে একটা বাহাদুর শাহ পার্কের দিক থেকে। চারজনের সারিতে বিন্যস্ত বলিষ্ঠ অবয়ব, ¯েøাগানে, গর্জনে দৃপ্ত পদক্ষেপের ভঙ্গিতে যেন একটি সশস্ত্র জলপ্রপাত। মনে সাহস জোগায়। দেখতে দেখতে রক্তে নেশা ধরে যায়। কী এক আকর্ষণে মিছিলে নেমে পড়ে নান্না। সুদীর্ঘ বিশাল জনস্রোত এঁকে বেঁকে এগিয়ে চলেছে দ্রুত পায়। রথখোলা পেরিয়ে গেল- ওরা চেয়ে ছিল তীক্ষè চোখে। কিন্তু কই ওরা বাধা দেয়নি তো, কিন্তু আরো বিস্ময় বাকি ছিল তার জন্য। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ওর চোখে পড়ল উত্তর দিক থেকে সৈন্য বোঝাই একটি ট্রাক আসছে, তখনই পেরিয়ে যাচ্ছে মিছিল।

কিন্তু না চৌধুরী সাইকেল কোম্পানি বরাবর এসে হঠাৎ সেটা থমকে দাঁড়াল। জওয়ানগুলোকে পজিশন নিতে দেখেই চমকে উঠে নান্না। ওর সজাগ দৃষ্টি বরাবরই ন্যস্ত ছিল ওদের উপর। ঘাড় বাড়িয়ে দেখে মিছিলের মুখ ইতোমধ্যে মতিলাল পেরিয়ে গেছে। অই নিরস্ত্র প্রতিরোধের হিং¯্র জবাব দিতে কি তৈরি হচ্ছে ওরা। ইতোমধ্যে কেমন করে জানি মিছিলেরও সে চেতনা সঞ্চারিত হয়ে গেছে। মিছিল দ্রুত এক সারিতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নিজেদের বিন্যস্ত করার কাজ শেষ হওবার আগেই সশস্ত্র গর্জনে আসে মৃত্যু-এরই মধ্যে কখন যেন নিশাত সিনেমার গলিতে ঘাপটি মারা জওয়ান ও পুলিশ দল রাস্তার ঠিক মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বেশ হিসাব-নিকাশ করা কাজ। ঠিক মিছিলের পাশেই কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে আর তক্ষুনি ধুপধাপ ট্রাক থেকে নেমে এল কয়েকটি সশস্ত্র জওয়ান, পাশ থেকে কয়েকজন পুলিশ। উদ্দেশ্য মুমূর্ষু বা আহতদের নিয়ে পালাবে। কিন্তু ক্ষিপ্ত জনতা ছেড়ে দেবে না ওদের। আরো কয়েক রাউন্ড সশব্দ ঝলকানি। স্টুডিও এইচ এর বন্ধ দরজা এবং সামনের লাইটপোস্টটির দেহ ক্ষত-বিক্ষত করে কোন দিক দিয়ে যেন বেরিয়ে গেল। মিছিলে বিশৃঙ্খলা জেগে উঠেছে। ওর আশপাশে এখন কোলাহল ¯েøাগান ইতস্তত ছোটাছুটি আরেকটি সশব্দ গর্জনের মাঝে হঠাৎ চোখে পড়ল পাশেই জোয়ান একটি ছেলে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে। বুকটা ধপ করে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। খোসমহল রেস্টুরেন্টের সামনে কালো পিচের সাদা শার্ট-প্যান্ট ক্রমেই লাল হয়ে যাচ্ছে। কোমরের ঠিক উপরে লেগেছে গুলিটা। কে যেন আটকে দিয়েছে নান্নার পা দুটো। নুয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করল নাম। জবাব এলো এক অচেনা স্বরধ্বনিতে: সিরাজুদ্দিন, বাসাবড়ি লেন… ইত্যাদি। হঠাৎ চিৎকার শুনে সজাগ হলো সে! লাশ নিয়ে পালাচ্ছে শালারা, দ্রুত অপসৃয়মাণ ট্রাকের গর্জন, আর সেই সঙ্গে অন্তত কয়েকটি ছাত্র-অছাত্র শহীদ নাম, কোনো দিন হয়তো জানা যাবে না। বুকটা মোচড় খেয়ে গেল তার। কিন্তু সিরাজুদ্দিন? একে কেমন করে হাসপাতালে পাঠাবো? শৃঙ্খল মিছিল এখন কিছুটা ছত্রভঙ্গ। কয়েকজন এগিয়ে এলো তাকে ঘিরে। হ্যাঁ লক্ষীবাজারের ছেলে ওরা, ঝুঁকে পড়ল অসহায় ওর মুখের ওপর। ওদের মধ্যে থেকে ইব্রাহিম ছুটে বেরিয়ে গেল। যেভাবেই হোক বন্ধ গ্যারেজ মুখে একটা রিকশা বের করে আনতে হবে। এতদূর পথ কাঁধে ফেলে নেয়া যাবে না। ঝিমিয়ে পড়ছে সিরাজুদ্দিন। জামাটা আরো লাল, মুখটা সাদা বিবর্ণ। নান্না এমন আর যেন মিছিলে নেই, ওর কানে ভাসছে ছেলেটির হতাশ কণ্ঠস্বর, চেনা পরিবেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা, সিরাজুদ্দিনের রক্তমাখা শার্ট হাওয়ায় উড়ে মিছিলের পথ দেখাচ্ছে। সিরাজুদ্দিনের শার্ট মিছিলের মুখে রঙিম পতাকা, তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টেনে নিয়ে চলল, ওর শেষ কথাগুলো তার কানে জল তরঙ্গের মতো বেজে চলেছে। সিরাজুদ্দিন আরো অনেকের সঙ্গে একাকার হয়ে মিছিলের মুখ হয়ে গেছে।’

২০০৫ সালে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের পরামর্শে নান্না মিয়ার সন্ধানে স্টেডিয়াম মার্কেট ও কলতাবাজারে অনুসন্ধান চালাই। তখন আর তিনি জীবিত নেই। সিরাজুদ্দিন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রাহের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকবার তাঁতিবাজার, বাসাবাড়ি লেন ও লক্ষীবাজার গিয়ে অনুসন্ধান করি। প্রবীণ লোকজনদের নাম ও শহীদ হওয়ার ঘটনা তারা শুনেছেন। তবে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj