রাজনীতি যাকে অরাজনীতিক বানিয়েছে

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাষ্ট্রপতি পদটি প্রশ্নাতীতভাবেই সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ। রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থায় তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের দেশের মতো সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও সম্মানের দিক থেকে তিনিই প্রধান ব্যক্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন যে অস্থায়ী সরকার কিংবা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল সেখানে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশের বিশতম রাষ্ট্রপতি। যদিও ইতোমধ্যেই তিনি দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতি পদে সরকারি দল আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া জনাব আবদুল হামিদ ছাড়া আর কেউ এই পদে প্রার্থী না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকেই দেশের একুশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন। অনেকের নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তাদের পরীক্ষিত সৈনিক বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকেই মনোনয়ন দিয়েছে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে। আগামী ২৩ এপ্রিল চলমান মেয়াদ শেষে তিনিই আবার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামের হাজি তায়েব উদ্দিন ও তমিজা খাতুনের ঘর আলো করে আজ থেকে ৭৪ বছর আগে যে ছেলেটি জন্মেছিল প্রত্যন্ত হাওরের এক কৃষক পরিবারে। কে জানত এই ছেলেই বাংলাদেশের দুই দুইবারের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হবেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আবদুল হামিদ নিশ্চয়ই স্বীয় যোগ্যতা বলেই এই জায়গায় সমাসীন হয়েছেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা দেখি কেবলমাত্র যোগ্যতা থাকলেও অনেক সময় সঠিক জায়গায় যাওয়া যায় না, সে ক্ষেত্রে ভাগ্যেরও প্রয়োজন হয়। জনাব আবদুল হামিদের ক্ষেত্রে ভাগ্যদেবী সব সময়ই তার পক্ষে ছিল। যখনই যেখানে সুযোগ পেয়েছেন ভাগ্যদেবীর সহায়তায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করল, জনাব হামিদ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হলেন। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে যখনই সংসদ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন নিজের দক্ষতা দিয়ে সংসদকে মাতিয়ে রেখেছেন, অধিবেশনগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। তৎকালীন সংসদ অধিবেশন দেখার জন্য বিশেষ করে জনাব আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে যেসব অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতো তা টিভি পর্দায় দেখার জন্য মানুষ চায়ের দোকানে ভিড় করত। তার বাচনভঙ্গি, সংসদ পরিচালনায় ভিন্ন আঙ্গিক বিশেষ করে মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্যের মাঝখানে নিজের কোনো দাবি বা মতামতকে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেয়ার যে পারদর্শিতা তা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। বিএনপি তখন বিরোধী দলের ভূমিকায়। তখনকার সংসদ খুবই উত্তপ্ত ও প্রাণবন্ত ছিল। তখনকার সংসদ পরিচালনা এত সহজ কাজ ছিল না। কারণ বিরোধী দল তখন কারণে-অকারণে ওয়াকআউট করত, সংসদে তখন খুবই আগ্রাসী বক্তব্য হরহামেশাই শোনা যেত। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ইন্তেকাল করলে ডেপুটি স্পিকার থেকে জনাব আবদুল হামিদকে স্পিকার নির্বাচিত করা হয়।

২০০১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয় এবং বিএনপি চারদলীয় জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। তৎকালীন সংসদের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ থেকে বিরোধীদলীয় উপনেতা মনোনীত হন জনাব আবদুল হামিদ। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন এবং দলীয় নেত্রীর আস্থা অর্জনে সক্ষম হন।

নির্বাচন নিয়ে জটিলতার সুযোগে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে ২০০৭ সালে ১/১১-এর মতো একটি কালো অধ্যায় যখন যুক্ত হলো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে, দুর্নীতির অভিযোগে যখন গণহারে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চলছে যা থেকে বাদ যায়নি দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। অবস্থা বুঝে যখন অনেকেই সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন ওই সময়েও জনাব আবদুল হামিদ নিজেকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে রাজনীতি করে গেছেন নিজের মতো করেই। অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই যখন জেলে তখনো জনাব হামিদ রাজনীতির মাঠ থেকে পালিয়ে বেড়াননি।

২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনাব হামিদ বাংলাদেশের সর্বাধিক সাতবার নির্বাচিত এমপিদের একজন হিসেবে পাস করেন এবং আওয়ামী লীগ তখন সরকার গঠন করে। জনাব হামিদকে তখন দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। স্পিকার নির্বাচিত হয়ে তিনি সাবলীলভাবে সংসদ পরিচালনা করতে থাকেন। সংসদকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় তাকে কঠোর হতেও দেখা গেছে। তারপরও তিনি সরকারি দল এবং বিরোধী দলের কাছে ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এসে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ইন্তেকাল করলে সংবিধান অনুযায়ী জনাব আবদুল হামিদ স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী সময়ে তাকেই দেশের বিশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। যে পদে তিনি এখনো বহাল আছেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন।

২. সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদটি একটি অরাজনৈতিক পদ। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ ছিলেন। তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করে ধারাবাহিকভাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রেকর্ড সংখ্যকবার এমপি, এমপি থেকে ডেপুটি স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার থেকে স্পিকার, বিরোধীদলীয় উপনেতা, স্পিকার, স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং সর্বশেষ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। এখন আবার দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি। রাজনীতিই তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আর অফিসিয়ালি রাজনীতিবিদ বলার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি হতে হলে নিয়ম অনুযায়ী সব রাজনৈতিক পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। যার শরীরে প্রবাহিত রক্তের প্রতিটি অণুতে অণুতে রাজনীতি জড়িয়ে রয়েছে, যিনি রাজনীতির রাজপথ, আলপথ মাড়িয়ে খান সেনাদের সঙ্গে বুক দাপিয়ে যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছেন, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিঃসন্দেহে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একজন রাষ্ট্রপতি। তাকে নিয়ে অদ্যাবধি কোনো মহল থেকেই কোনো বিতর্ক শোনা যায়নি। বরং বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মুখেও তার প্রশংসা শুনেছি সময়ে সময়ে।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি তার জীবনের পুরোটা সময় খাটিয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তথা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে ঐতিহাসিক সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে সেই নির্বাচনে জনাব আবদুল হামিদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে তৎকালীন ময়মনসিংহ-১৮ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সত্তরের নির্বাচন থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে যে কয়টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে (১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। কাজেই তার প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার অবকাশ ছিল না) সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে কেবল একটি নির্বাচন যেটি জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই নির্বাচন ছাড়া বাকি সব নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন জনাব আবদুল হামিদ। এলাকার মানুষ যেমন তাকে সারা জীবন ভোটের বাক্স ভরে তাদের ভালোবাসা দিয়েছেন তেমনি তিনিও এলাকার মানুষের পাশে থেকে বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি যখন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন তারপর থেকে অদ্যাবধি অবহেলিত বিচ্ছিন্ন হাওর জনপদকে বিশেষ করে তার নির্বাচনী এলাকা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামকে বিদ্যুতায়নসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পাস করার পর আর খুব বেশি একটা এলাকায় যেতে চান না কিংবা এলাকার কোনো উন্নয়নমূলক কাজ উদ্বোধন করে দিয়ে আর কোনো তদারকি বা খোঁজখবর রাখেন না সেই জায়গায় বর্তমান রাষ্ট্রপতি তার এলাকায় যে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে সেসব পরিদর্শনের জন্য নিজে প্রায়ই এলাকায় ছুটে যান। রাষ্ট্রপতির এলাকার একজন নগণ্য মানুষ হওয়ার সুবাদে এটুকু অন্তত জানি যে, তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর যেভাবে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে এলাকার সাধারণ মানুষ বঙ্গভবনে গেছেন অতীতে এত বেশি ভিজিটর বঙ্গভবনে গেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান রাষ্ট্রপতি একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ ছিলেন বলেই।

ভাটিশার্দুল খ্যাত বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ হাওরের মানুষের কাছে এখনো ‘হামিদ সাব’ নামেই সমাদৃত। অবশ্য অনেকের কাছে এখনো তিনি হামিদ ভাই। সারা জীবন মানুষের কাছাকাছি থেকে রাজনীতি করার কারণে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের সংস্পর্শ তিনি খুবই মিস করেন সেটা বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। দেশের একটি অস্বস্তিকর পরিবেশে, একটি রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে, নির্বাচনের বছরে তিনি আবারো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সংকট কাটিয়ে চলমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে দেশের একুশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও তিনি কি ভূমিকা পালন করেন সেটাই দেখার প্রত্যাশায় দেশের সুশীল থেকে আপামর জনসাধারণ।

গাজী মহিবুর রহমান : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj