বিএনপির বঙ্গবন্ধুবিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার আগ মুহূর্তে লন্ডনে বিএনপির একদল উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মী বাংলাদেশ দূতাবাসে আকস্মিভাবে হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাদের অপদস্থ করেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বের করে এনে প্রকাশ্য দিবালোকে তাতে জুতা পেটা করেছে, শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুর করা হয়েছে। শুধু তাই নয় তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের কুৎসিত শব্দ উচ্চারণ ও নর্তন-কুর্দন যে করেছে তার ভিডিও দৃশ্য সে দিন সামাজিক গণমাধ্যম এবং টিভি চ্যানেলের খবরে দেখানো হয়েছে। উপস্থিত নেতাকর্মীদের ভাবভঙ্গির প্রকাশ থেকে তাদের কোনো সভ্য মানুষ হিসেবে অভিহিত করা যায় কিনা সেটিই বড় ধরনের প্রশ্নের বিষয় হতে পারে। অথচ তারা গিয়েছিল মামলার বিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট জায়গা অতিক্রম করার কোনো অধিকার তাদের ছিল না। কিন্তু বিএনপির সমবেত নেতাকর্মীরা ব্রিটিশ আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ দূতাবাসে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে, দূতাবাসে কর্মরত কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে হেনস্তা করেছে, বঙ্গবন্ধুর ছবি খুলে এনে বাইরে তাদের বিকৃত রুচি তথা মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, অথচ বঙ্গবন্ধু এখন বেঁচে নেই, সরকারে নেই, তিনি এই মামলার কোনোভাবে অংশও নন। দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার আগে দূতাবাসের সম্মুখে প্রতিবাদ করাটা কতটা আইনসম্মত হয়েছে সেই প্রশ্নই যেখানে গুরুতরভাবে উঠতে পারে, সেখানে চার দশকের বেশি আগে নিহত বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে মাথার রক্ত গরম হওয়া নেতাকর্মীদের মানসিকতার জিনতত্ত্ব খোঁজার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

ছবিতে যেসব তরুণ এবং যুবককে দেখা যাচ্ছে তারা ব্রিটেনের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করেও যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো শিক্ষা নেয়নি, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করার পর সেই সব দেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক কোনো প্রভাব তাদের ওপর পড়েনি- তেমন বাস্তবতাই তাদের আচরণ ও অপকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। এমন নেতাকর্মীরা আর যাই হোক কোনো দেশের গণতন্ত্রের কর্মী হতে পারে- এমনটি বিশ^াস করার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই, এদের হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়, দেশের মহৎ, রাজনৈতিক অর্জনও নিরাপদ নয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য তো নয়ই। এরা আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকেই শ্রদ্ধা করতে শেখেনি, অশ্রদ্ধা ও ঘৃণাবোধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাতাদের ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করে না। যারা নিজের দেশের এমন গৌরবময় ইতিহাসকে পদদলিত করছে বা করতে দ্বিধা করেনি। স্বাধীনতার মহান নেতার প্রতি আক্রোশ প্রকাশ করছে- তাদের এমন মনোবৃত্তি রাষ্ট্রদ্রোহী, একাত্তরের পাষণ্ড ঘাতক, পাকিস্তানি-হানাদার, আলবদর-আলশামস, রাজাকার বাহিনীর আদর্শ দ্বারা বেড়ে উঠেছে। একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধী ছিল তাদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এসব তরুণ ও যুবকের মতাদর্শগত অমিল নেই, এরা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ কিংবা লালিত-পালিত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবুজ পাসপোর্ট সুবিধা নিয়ে বিদেশে যাওয়া আসা ও থাকার সুবিধা ভোগ করেও একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের এরা ঘৃণা করার বোধশক্তি গ্রহণ করতে পারেনি। বরং ওইসব অপশক্তির পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই যেন জন্মগ্রহণ করেছিল সেই দেশবিরোধী আদর্শকে ধারণ ও বহন করাই যেন তাদের জীবনের ‘সার্থকতা’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সব চাইতে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের অনুঘকটদের সমর্থক থেকে সেনা প্রধান হলেন, তারপর হলেন সামরিক শাসক ও ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব- যিনি দেশটা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ধারায় চলে যেতে পথ খুলে দিলেন, মুক্তিযুদ্ধের শক্তির পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দিলেন, নিজে দল গঠন করলেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধীদের প্রাধান্য দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় মৌলনীতি চেতনাগতভাবে পরিত্যাজ্য করার পথ অবলম্বন করলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নিয়ে বিভ্রান্ত সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র তত্ত্ব হাজির করলেন, গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলেন। বস্তুত চার জাতীয়নীতির মনগড়া তত্ত্বের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মতাদর্শের বিকাশে দেশের রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সুযোগ করে দিলেন, তার গঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী সাবেক, তৎকালীন এবং বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশের নির্ভরশীল প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে। দিন যত অতিবাহিত হয়েছে, বিএনপি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী শক্তিসমূহের আশ্রয়ের প্রধান সংগঠনে পরিণত হয়েছে। দলটিকে বিএনপির নেতৃত্ব একটি আওয়ামীবিরোধী প্লাটফর্মে পরিণত করেছে। সেই বিরোধী প্লাটফর্মের নেতাকর্মীদের বহিঃপ্রকাশ অতীতেও অনেকভাবে ঘটেছে। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি সমর্থকগণ আওয়ামী নিধনে কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল- তা ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সেই সময় পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিঃশেষ করে দেয়ার মাস্টারপ্লান বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। সেখানে ২১ আগস্টের মতো হত্যাকাণ্ডের পেছনে আওয়ামীবিরোধী মানসিকতার নজির খুঁজে পাওয়া গেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা, কথাবার্তায় সেই বিরোধিতার প্রমাণ পাওয়া যেত। সেই সময় পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পুরোপুরি বিকৃত করা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতার অবস্থান থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানকে দলগতভাবে বিএনপি এবং তৎকালীন জোট সরকার স্বাধীনতার ঘোষকই শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের মূলনেতার আসনে বসানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবময় ইতিহাসকে এভাবে দখল করা যায় না- তা জানা সত্ত্বেও বিএনপি ও জামায়াত জোট তখন সেই ইতিহাসকেই দখল করে নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত নেতা হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে ও রাজনীতিতে তুলে ধরা হয়েছিল। ক’বছর আগেও লন্ডনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার উদ্যোগ নেন, তাতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নয়, জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধকালে প্রথম রাষ্ট্রপতি বলে দাবি করেন, এর সপক্ষে তিনি মনগড়া নানা তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। সুতরাং এখন লন্ডন হাই কমিশনে যখন বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রবেশ করে হামলা করে, বঙ্গবন্ধুর ছবি বের করে এনে নিজেদের উল্লাসসহ এর প্রতি ন্যক্কারজনক আচরণ করে তখন বলতে হবে- এটিও বিএনপির মননগত সমস্যা, মনোজগতের উগ্র, হঠকারী, ইতিহাসবিরোধী, দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এর মূলনেতা বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ না করতে পারার সমস্যা। এই সমস্যা লন্ডনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়, কিংবা তারেক রহমান লন্ডনে আছেন বলে সেখানকার নেতাকর্মীরা উৎসাহী হয়ে করেছেন- তা-ই নয়। দেশের অভ্যন্তরেও বিএনপির কোনো নেতাই বঙ্গবন্ধু উপাধিসহ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম কখনো উচ্চারণ করেন না। তার নামের আগে ‘মরহুম’ শব্দটি ব্যবহারের মানে বোঝা যায় না। জগতের কোনো নেতা কী চিরকাল বেঁচে থাকেন? তাদের নামের আগে ‘মরহুম’ শব্দটি ব্যবহার করতে শুনি না। জিয়াউর রহমানও তো বেঁচে নেই। তার নামের আগে ‘শহীদ’ বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দিয়ে ‘মরহুম’ শেখ মুজিবুর রহমান ব্যবহার করায় এক হাস্যকর প্রবণতা বিএনপির সব নেতার মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপির কোনো নেতাই বঙ্গবন্ধুকে জাতির স্থপতি, জনক ইত্যাদিতে বিশ^াস করেন না, তারা বরং জিয়াউর রহমানের নামের আগে স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নামে তাদের নেতার নাম উচ্চারণ করেন। বিএনপি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে মানতে রাজি আছে, সে ক্ষেত্রে এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী পর্যন্ত তারা মানতে রাজি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নয়, জিয়াউর রহমানকে তারা স্বাধীনতার ঘোষক হরহামেশা বলছেন, লন্ডন থেকে যেহেতু তারেক রহমান সাহেব মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম ‘আবিষ্কার’ করেছেন, তাই ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে জিয়াউর রহমানের নামের আগে ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট’ সংযোজিত হবেই- এটি নিয়ে দ্বিধা থাকার কোনো কারণ নেই। তারেক রহমান সাহেব এমনি এমনি গবেষণা করে উক্ত ‘আবিষ্কার’ করেননি। তিনি যেহেতু বিএনপির মূল কাণ্ডারি তাই তার ইচ্ছার প্রতিফলন দলের নেতাকর্মীরা ঘটাবেই, ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো কারণ নেই। নেতাকর্মীরাও সে ধরনের মানসিকতাই পোষণ করেন। তারা ক্ষমতায় এলে দেশে এখন বঙ্গবন্ধুর যত ছবি রয়েছে তা ভেঙে তছনছ করার মহোৎসব ঘটবেই এটি কেউ ঠেকাতে পারবে না। কেননা, লন্ডনে যে কজন বঙ্গবন্ধুর ছবির প্রতি অবমাননা করেছেন তাদের অনুসারি অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মী রয়েছে। তারা সুযোগ পেলে এখনো মাঝেমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছবি তছনছ করে, তবে আইনি ভয়ে ছবি ভাঙচুর না করলেও বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে দেখে কখনো শ্রদ্ধার কোনো ধরনের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বলে জানা নেই। বিএনপি দলগতভাবেই বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭১-এর মূল নেতা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ বা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে স্বীকার করে না। নিকট-অতীতে কয়েকবার তারা বঙ্গবন্ধুর নাম স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষত জনগণের ভোট পেয়ে যখন তারা ক্ষমতায় যায় তখন তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে উচ্ছেদ করতে সবই করার চেষ্টা করে থাকে। এ নিয়ে যত সমালোচনাই শিক্ষাঙ্গন বা গণমাধ্যমে থাক না কেন, বিএনপি তাতে কর্ণপাত করেননি, করবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। কেননা যে দল ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনে খালেদা জিয়ার নকল জন্মদিন তৈরি করে কেক কেটে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করতে পারে- সেই দল বঙ্গবন্ধুকে কী দৃষ্টিতে দেখে- তা সহজেই অনুমেয়। এখন লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে যে পৈশাচিক উল্লাস প্রকাশ করেছে তা দেখে মনে হয় এরা যদি জীবিত বঙ্গবন্ধুকে পেত তাহলে তাদের কুৎসিত মনোবৃত্তির আরো নগ্ন প্রকাশ ঘটাতে তারা দ্বিধা করত না। এরা বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা এবং তাদের সন্তানদের সম্পর্কেও প্রায় একই ধরনের জিঘাংসার মনোবৃত্তি পোষণ করে থাকে। তাদের দুঃখ বা কষ্ট আসলে কিসে? পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মূল নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন বলেই কি? আসলে রাজনীতিতে এমন প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, বিদ্বেষ পোষণকারী দলকে নিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশা করে কীভাবে- তা মস্ত বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হচ্ছে বলে মনে হয় না। এখানেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে সংকটের মূল কারণসমূহ নিহিত।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj