রোহিঙ্গা বসতি : পাঁচ হাজার একর পাহাড়-বনাঞ্চল বিনাশ

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

গফুর মিয়া চৌধুরী, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি : মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে দেশের ৫ হাজার একক গভীর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা জ্বালানি হিসেবে কাঠ সংগ্রহ করতে সামাজিক বনায়ন ধ্বংস, যততত্র পয়ঃনিষ্কাশনসহ নানা কারণে পুরো এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলেছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার নামে উখিয়া- টেকনাফে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর আনাগোনা বেড়ে যায়। সক্রিয় হয়ে উঠে নারী-শিশু পাচারকারী চক্র।

বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখের বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ৮ লাখ রোহিঙ্গা। তবে স্থানীয়দের মতে, নতুন-পুরাতন মিলে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার অবস্থান উখিয়া-টেকনাফে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ লাখ লাখ রোহিঙ্গার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছে না স্থানীয় বাজারগুলো। ফলে হাটবাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের মূল্যও লাগামহীন।

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণ কক্সবাজারের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ উখিয়া কলেজে সেনাবাহিনী ও বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ১৩টি ত্রাণ সংরক্ষণাগার করায় শ্রেণি কক্ষের স্বল্পতা ও পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় উপস্থিতির হার কমে গেছে। এছাড়া রোহিঙ্গা আসার কারণে স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেঢ়ে এনজিওর চাকরিতে ব্যস্ত। ক্যাম্পভিত্তিক এনজিওগুলোতে অযোগ্যদের চাকরি দেয়ায় স্থানীয় শ্রম বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা চিকিৎসাসেবাও যাচ্ছেন না। এদিকে উখিয়া-টেকনাফের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম। পাসপোর্ট ইস্যু, ভিসা সংক্রান্ত কাজে, চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ যেতে বাধাগ্রস্ত রোগীরা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরিতে, নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদে, নবজাতক শিশুর জন্মনিবন্ধনসহ প্রবাসে অবস্থানরতরা পড়েছে বিপাকে।

মালেয়শিয়া প্রবাসী বিপন বড়ুয়া মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, পূর্বের হাতের লেখা জন্মনিবন্ধন আছে তার। নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করতে ডিজিটাল এবং ইংরেজি ভার্সনে জন্মনিবন্ধন দরকার। রোহিঙ্গাদের কারণে এ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। একই ভোগান্তিতে পড়েছেন ফ্রান্স প্রবাসী সুজন বড়ুয়া।

জানা যায়, রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের ৭টি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, বালুখালীর ঢালা, থাইংখালী বাঘঘোনা ও তানজিমার ঘোনা এবং টেকনাফের পুটিবনিয়া ও কেরণতলীর সংরক্ষিত পাহাড় উজাড় করেছে। কক্সবাজার-টেকনাফ শহীদ এটিএম জাফর আলম সড়কের দুপাশে অধিকাংশ জায়গা জুড়ে ছিল সবুজ বনানী। যা ন্যাড়া করে প্রথম দিকে সারি সারি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে রোহিঙ্গারা। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার (দক্ষিণ) বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, পিএফ ও রিজার্ভ বনাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার একর রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। অক্ষরজ্ঞানহীন এসব রোহিঙ্গাদের কাছে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এরা যেখানে খাবার খায়, সেখানে মূত্র ত্যাগ করে। যেখানে ঘুমায়, সেখানেই ময়লা ফেলে। এরা পাহাড় কেটে, আর্বজনা ফেলে পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরসা সদস্যরাও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে আশঙ্কা পর্যবেক্ষকদের। তারা ক্যাম্পগুলোতে এবং ক্যাম্পের বাইরে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। এ বিষয়ে উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাইলাউ মারমা বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গা স্রোতের সঙ্গে কিছু দুষ্কৃতকারী আসতে পারে। তবে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পুলিশি টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj