ঝুলে গেছে প্রত্যাবাসন? >> রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা বিবেচনায় বিলম্ব : সরকার

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

কৈলাস সরকার : সেনা বাহিনীর সহিংসতার মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নানা কারণে ঝুলে গেছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি ঝুলে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মিয়ানমার সরকারের গড়িমসি, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিতে বিলম্ব এবং রাখাইনে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ। অবশ্য আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের সঙ্গে বাংলাদেশও একমত। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় এই বিলম্ব। তবে ক‚টনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছুটা বিলম্ব হলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি ঝুলে যায়নি, বরং সময় ও যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হলে ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি সুফল বয়ে আনবে।

উল্লেখ্য, জাতিগতভাবে নিধনের উদ্দেশ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে গত কয়েক দশক ধরে। কিন্তু গত ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে এবং সর্বশেষ গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে অভিযানের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করে নির্মমভাবে। সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা, ধর্ষণের শিকার হয়েছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি। সহিংসতার ঘটনায় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে থেকেই আরো চাল লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

এই নারকীয়তার প্রতিবাদে সমগ্র বিশ্ব স্বোচ্ছার। রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা এবং মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছে বিশ্ব সম্প্রদায়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং এ ব্যাপারে গত বছরের ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা হয়নি। এমনকি কবে থেকে শুরু হবে তাও নির্দিষ্ট করে কিছু বলছে না কেউ। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১২ জানুয়ারি ভ্যাটিকান সিটি সফরে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হলেও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে তিনি মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি ও তা অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রত্যাবাসনে বিলম্বের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই প্রত্যাবাসনে বিলম্ব হচ্ছে। গত ১২ জানুয়ারি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ক‚টনীতিকদের নিয়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরো জানান, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তদারকি করার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করেছে এবং প্রত্যাবাসন শুরুর পর যাতে কোনো নেতিবাচক কিছু না ঘটে সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রত্যাবাসনের পর কোনো কারণে যদি রোহিঙ্গারা আবার পালিয়ে আসে, তা প্রত্যাবাসনকে ব্যাহত করবে। তাই কিছুটা বিলম্ব হলেও সরকার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চায় বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে কত দিনের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে নিশ্চিত না করে তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা হবে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের তাগিদ আন্তর্জাতিক মহলেরও। ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ নিষয়ে তাদের অবস্থান আগেই জানিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট এ্যালেইন বারসেত, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন ও ইইউ প্রতিনিধি দল একই বিষয়ে জোর দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ক‚টনৈতিক বিশেষজ্ঞ ওয়ালিউর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলেও প্রক্রিয়াটি ঝুলে যায়নি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ঘনীভূত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গতিতে যদি একটু ধীরতা এসেও থাকে, তাতে আমাদের ক্ষতি নেই। বরং তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে।

বিভিন্ন কারণে এই প্রত্যাবাসনে বিলম্ব হচ্ছে উল্লেখ করে ওয়ালিউর রহমান বলেন, প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমাদের কিছু কাজ বাকি ছিল। তারপর সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা প্রত্যাবাসনের তদারকি করবে। তাছাড়া প্রস্তুতি দুপক্ষেরই নিতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত, কিন্তু মিয়ানমারে এখনো হয়নি। রোহিঙ্গারা গিয়ে থাকবে কোথায়? তাদের জন্য ঘর করতে হবে। ভারত এবং চীন রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু যে ঘর তৈরি করা হয়েছে তা তো সাত-আট লাখ মানুষ বা তিন লাখ পরিবারের জন্য হয়নি। আরো অনেক বাড়িঘর তৈরি করতে হবে। কমপক্ষে তিন লাখ ঘর তৈরি হতে হবে।

সব রোহিঙ্গাকে কি মিয়ানমার ফেরত নেবে এবং আন্তর্জাতিক মহল বলছে, রাখাইন পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত নয়, আসলে ব্যাপারটা কি? এ প্রশ্নের জবাবে ওয়ালিউর রহমান বলেন, চুক্তি যেহেতু হয়েছে, অবশ্যই ফেরত নেবে। তাদের বাধ্য করা হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মহলকে আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি এবং তা অব্যাহত রাখার জন্য। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে আমি বা আমরা একমত। আমরা চাই না রোহিঙ্গারা রাখাইনে গিয়ে ক্যাম্পে থাকবে। তাদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করতে হবে।

আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুন্সি আহমদ ফয়েজ বলেন, বিলম্ব হলেও নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ দেখি না আমি। বিলম্ব হবে এ কথা আগেই বলা হয়েছিল। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। হতাশ হলে চলবে না, ধৈর্য ধরতে হবে এবং চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে আরো উন্নত কিছুর জন্য।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj