প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন সহিংসতায় নিহতদের স্বজনরা
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবন। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীও বুকে টেনে নেন তাদের। আবেগাপ্লুত বঙ্গবন্ধুকন্যা কারো মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, মুছে দেন চোখের পানি। অশ্রæসজল প্রধানমন্ত্রী সান্ত¡না দেন সবাইকে। উপস্থিত স¦জনদের সবার সঙ্গে কথা বলেন তিনি, নেন প্রত্যেকের খোঁজখবর। এ সময় গণভবনের ব্যাংকোয়েট হলে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশের।
গতকাল রবিবার দুপুরে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় গণভবনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৩৪ জনের পরিবারের সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী এ সময় এসব পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থ তুলে দেন। আশ্বাস দেন ভবিষ্যতে পাশে থাকার পাশাপাশি এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের। গণভবনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত প্রমুখ।
নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সময় অশ্রæসজল প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্ত¡না দিয়ে বলেন, আমাকে দেখেন, আমি কত শোক নিয়ে বেঁচে আছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি স্বজন হারিয়েছি। আমি তো বুঝি আপনাদের কষ্ট, আপনাদের বেদনা। প্রতিনিয়ত বাপ-মা-ভাই ও স্বজনদের হারানোর ব্যথা নিয়ে আমাদের চলতে হয়। এমনকি তাদের লাশটাও তো আমি দেখতে পারিনি, কাফন-দাফনটাও করতে পারিনি। দেশেও ফিরতে পারিনি, ছয় বছর আসতে দেয়নি আমাকে।
সহিংসতায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতক্ষণ বেঁচে আছি আপনাদের পাশে আছি। আমি আসলে আপনাদের কী বলে সান্ত¡না দেব? শুধু এটুকু বলব যে, আমি আপনাদের মতোই একজন।
বাবা-মা, ভাই হারানো সেই এতিম। কাজেই আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি। আমি আছি আপনাদের জন্য, আপনাদের পাশে। তিনি বলেন, ৮১ সালে যখন দেশে এসেছি, সারা বাংলাদেশ ঘুরেছি। চেয়েছি যেন এদেশের মানুষের একটু...আমার বাবা বলতেন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। আমি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটাবে, এই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাবে, এটা তো কাম্য নয়।
সহিংসতার সময় খুনের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের বিচার করতে হবে, তা না হলে মানুষের নিরাপত্তা দেয়া যাবে না। আমার চেষ্টা থাকবে যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত, খুঁজে খুঁজে বের করে তারা অবশ্যই যেন শাস্তি পায়, সেটাই আমার প্রচেষ্টা থাকবে, আমি সেটাই করব।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, মানুষ কী দোষ করলো যে এভাবে মানুষ খুন করতে হবে! মানুষ খুন করে সরকার পতন, এটা কবে হয়, কখন হয়? সাধারণ মানুষ কী দোষ করেছে? অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে নিহতদের স্বজনদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, আমি আপনাদেরও সাহায্য চাই। যদি আপনারা কিছু জানেন আমাদের জানাবেন। কারণ, এভাবে বারবার বাংলাদেশটাকে নিয়ে খেলা এটা আর হতে দেয়া যায় না। কাজেই আমি আপনাদেরই সাহায্য চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ মেরে লাশ ঝুলিয়ে রাখার মতো এই বর্বরতা, জানোয়ারের মতো ব্যবহার এটা কি কেউ করতে পারে? একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের লাশ ঝুলিয়ে রাখবে পা বেঁধে! যারা এগুলোর সঙ্গে জড়িত অবশ্যই তাদের বিচার হবে। তাদের বিচার করতে হবে, তা না হলে মানুষের নিরাপত্তা দেয়া যাবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা দেখেছেন প্রত্যেকটা জিনিস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। যেখানে মানুষ সেবা পাবে সেই জায়গাগুলো, সেই কোভিড হাসপাতাল থেকে শুরু করে যে যে জায়গায় আমরা মানুষের জন্য কাজ করব সেই জায়গা, প্রত্যেকটা জায়গা একে একে পুড়িয়ে দেয়া; আর এভাবে গুলি করে মানুষ মারা। স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের কাছে শুধু এটুকু বলবো, আপনারা সবর করেন। আর আল্লাহকে ডাকেন যেন এই সমস্ত খুনি-জালেম, এদের হাত থেকে আমাদের দেশটা যেন রেহাই পায়।
কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের দাবি মানা ও ধৈর্য ধরে তাদের বোঝানো হয়েছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ধৈর্য ধরে সব সময় তাদের বোঝানো, তাদের সঙ্গে কথা বলা, সব চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজকে চারদিকে এই হাহাকার। এটা তো সহ্য করা কষ্টকর। যারা আন্দোলন করেছে, তাদের সব দাবিই তো মেনে নিয়েছি। তাতেও নাকি দাবি শেষ হয় না। একটা মানি তো আরেকটা। তারপর আরো দুইটা। আবার চারটা। আবার আটটা। এ কী? বারবার বলেছি যে ঠিক আছে, আমরা দেখছি। যা দাবি সবই তো মানলাম।
নিহতদের স্বজনরা গণভবনে আসায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই এসেছেন কষ্ট করে, দুঃসময়ে। আজকে যদি ভালো সময় হতো কত হাসিখুশি করে সবাই যেতে পারতেন। আর এখন আমারও আপনাদের চোখের পানি দেখতে হচ্ছে। এটিই সবচেয়ে কষ্টের! বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রীকে বারবার আবেগাপ্লæত হতে দেখা যায়।
নিহত যাদের পরিবার আর্থিক সহায়তা পেলেন : রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পরিবার, চট্টগ্রাম সরকরি কলেজের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরামের পরিবার, নোয়াখালী বেগমগঞ্জের কাঠমিস্ত্রি ফারুক হোসেনের পরিবার, বরিশাল এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল ইসলাম শান্ত, ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী নীলফামারীর সবুজ আলী, কামরাঙ্গীর চরের পাপোষ বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহজাহান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা নাজমুল হোসেন ও সাকিবুল হাসান সুমন, গাজীপুর মহানগর শ্রমিক লীগ নেতা নূরে আলম, বরিশালের আওয়ামী লীগ কর্মী মো. রোমান, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী বাকের মিয়া, নরসিংদী শিবপুরের মৎসজীবী লীগের সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম টিপু, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগ নেতা মমিনুল ইসলাম হৃদয়, মো. বাবুল ও তানিম, কৃষকগঞ্জ পাকুন্দিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ইমাম মেহেদী হাসান, সিলেটের সাংবাদিক এটি এম তুরাব, ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক হাসান মেহেদী, মোহাম্মদপুর ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহরিয়ার হোসেন রোকন, পুলিশ পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া, ট্যুরিস্ট পুলিশ মোহাম্মদ মোকতাদির, ডিএমপির নায়েক মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, ফরিদপুরের আনসার সদস্য মোহাম্মদ জুয়েল শেখ, সাতক্ষীরার আসিফ হোসেন, কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালীর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবীব, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া ফাইয়াজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, চট্টগ্রাম বদ্দারহাটের মুদি দোকান কর্মচারী সাইমন প্রধান মাহিন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ নেতা কবির হোসেন, কদমতলী আওয়ামী লীগ কর্মী জসিম উদ্দিন, মিরপুর-১৪ এলাকার ১০ বছরের শিশু শাফকাত সামির, বাড্ডা বাগানবাড়ী ইউনিট আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সোহেল, যুবলীগ কর্মী বিপ্লব শেখ এবং যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ নাদিমের পরিবার। নিহত এসব ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
