×

অপরাধ

আলাউদ্দিন নাসিমের অজানা অধ্যায়

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৫৩ পিএম

আলাউদ্দিন নাসিমের অজানা অধ্যায়

শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। ছবি: সংগৃহীত

আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের পথের কাঁটা ছিলেন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক। তার জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার প্লান করেন তিনি। কারণ, একরাম না থাকলেই ফেনী-১ আসনের সংসদ-সদস্য হওয়ার পথ খুলে যাবে তার- এমন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন নাসিম। শেষমেশ সেই পথেই হাঁটেন। ফলে ঠান্ডা মাথায় একরামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।

দুর্নীতির দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি হয়ে ২০০৯ সালে উপসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। চাকরি ছেড়ে এমপি হওয়ার খায়েস নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ান তিনি। তবে তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক। তার জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার প্লান করেন শেখ হাসিনার এক সময়ের প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন নাসিম। ২০১৪ সালের ২০ মে সকালে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় গাড়িতে থাকা একরামকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, কুপিয়ে, গুলি করা হয়। পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

পুরো ঘটনাটি ঘটে আলাউদ্দিন নাসিমের প্লান অনুযায়ী। অথচ তিনি বরাবর থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একরামুল হককে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে বা কারা, তা নিয়ে অনেক রহস্যই ছিল উদঘাটনের বাইরে। তবে মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহের তালিকায় ছিলেন ফেনীর আলোচিত-সমালোচিত আলাউদ্দিন নাসিম।

ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে আলাউদ্দিন নাসিমের নাম। একাধিক মানুষ হত্যা করলেও সবসময় থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। হাসি তামাশার মাধ্যমে মানুষ খুনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কেউ তার সঙ্গে বেয়াদবি করলে একমাত্র শাস্তি মূত্যু। মানুষ হত্যা ছিল আলাউদ্দিন নাসিমের নেশা। চট্টগ্রামের প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে তার হাত।

পুলিশসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একরামের ওপর হামলা হবে, তার গাড়ি ভাঙচুর ও জামাকাপড় ছিঁড়ে দিয়ে অপদস্থ করা হবে—এ কথা ফেনীর আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেই জানতেন। তবে খুন করার পরিকল্পনার কথা জানতেন অল্প কজন। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, একরামের স্বদলীয় প্রতিপক্ষ তাকে খুন করেছে।

পরে জয়নাল হাজারী ঢাকায় বিভিন্ন টেলিভিশনে ও পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে একরাম হত্যার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা আলাউদ্দীন নাসিমকে ফেনীর রাজনীতির নিয়ন্ত্রক উল্লেখ করে বলেন, ‘আলাউদ্দীন নাসিমকে বলতে চাই, তুমি এই খুনিদের বাঁচানোর চেষ্টা করো না। তুমি ফেনীর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করো। এখন যে ঘটনা ঘটলো, তাতে তুমি ফেনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবা। তুমি যদি খুনিদের প্রতি কঠোর-নিরপেক্ষ হও, তাহলে ওয়াদা করছি, আমরা তোমার সঙ্গেই থাকব। তোমার সঙ্গে শত্রুতা করবো না, বিরোধিতা করবো না।... খুনিকে প্রশ্রয় দিলে খুনের দায়দায়িত্ব তোমার ওপর যাবে। এই খুনের দায় তুমি এড়াতে পারো না।

জুলাই-আগস্টে বৈষাম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ফেনীর মহিপালে আলাউদ্দিন নাসিমের নির্দেশে গুলি করে ১৩ জনকে হত্যা করা হয়। তবুও দৃশ্যমান কোনো অ্যাকশন নেই তার বিরুদ্ধে। মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেকের নামে মামলা হলেও এখনও সেখানে এ খুনির নাম নেই। হাসিনা ও রেহানার ফান্ড ম্যানেজার হিসেবে দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করলেও তার বিরুদ্ধে এখনও মামলা হয়নি দুদকে।

কুখ্যাত রাজাকার সালেহ উদ্দীন আহমেদের সন্তান আলাউদ্দিন নাসিম শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট হওয়ায় ফাঁপরবাজি করে বিনা পূঁজিতে ব্যবসায়িক পার্টনার হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রকল্প থেকে বিদেশে পাচার করেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। ডাচ-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লোন নিয়ে বিদেশে পাচার করেন তিনি।

জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে আলাউদ্দিন নাসিমের বিরুদ্ধে। সংবাদ মাধ্যমে ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক বলা হলেও এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেডের মালিকানায়ও তিনি রয়েছেন। প্রতিমাসে ব্যাংকে এসএস পাওয়ার থেকে মোটা অংকের চেক আলাউদ্দীন নাসিমের এবং তার ওয়াইফ প্রফেসর ডা. জাহানারা আরজুর নামে জমা হতো। এমন একটি চেকের কপি আমাদের হাতে এসেছে।

হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন নাসিম দেশটিকে বানিয়েছিলেন অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘স্বর্গরাজ্য’। মিস্টার টোয়েন্টি পার্সেন্ট হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন দেশব্যাপী। তাকে ২০ পার্সেন্ট কমিশন না দিলে কোনো টেন্ডারই পেতো না ব্যবসায়ীরা। প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই তিনি বুঝে নিতেন কমিশনের টাকা। বিভিন্ন সময় দুর্নীতির কারণে অনেকেই ধরা পড়লেও সব সময় অন্তরালে থেকে যেতেন দুর্নীতির বরপুত্র খ্যাত আলাউদ্দিন নাসিম। শেখ হাসিনার ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন বহাল তবিয়তে। বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী এই সাবেক এমপিকে ব্যবসায়িক পার্টনার বানিয়ে কোনো রকম টেন্ডার বা প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় বড় প্রকল্প বাগিয়ে নেন এক আলোচিত ব্যবসায়ী। তাকে সামনে রেখেই চালানো হয় লুটপাট।

ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র করে চলছে ফ্যাসিস্ট মাদক সম্রাট আলাউদ্দিন নাসিম। অবৈধভাবে ভারতের কলকাতা পালিয়ে পতিত হাসিনার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন তিনি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে ভারতের ভূঁইফোড় মিডিয়ার গুজব প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সামনে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছেন এই মাফিয়া।

আলাউদ্দিন নাসিমের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের গুজব সেল। কারণ, হাসিনা ও রেহানার ফান্ড ম্যানেজার তিনি। দুই বোনের চোরাই টাকা তার জিম্মায় রয়েছে। আর সেই অর্থ ব্যয় করছে ড. ইউনূস সরকারকে ব্যর্থ করার মিশনে। কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে ফান্ডিং করছেন দুর্নীতিবাজ আলাউদ্দিন নাসিম। বাংলাদেশ থেকে যারা পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন তাদের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয় তদারকি করছেন দুর্নীতির বরপুত্র ও দেশের অন্যতম মাদক ব্যবসায়ী।

তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন করায় ২ অক্টোবর আলাউদ্দিন নাসিমের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ফেনীর সাবেক এমপিকে ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে দুদক নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের সম্পদের অনুসন্ধান করছি। তার অনেক সম্পদের তথ্য পাচ্ছি। আমরা ওনার বিষয়ে সার্বিকভাবে খোঁজখবর নিচ্ছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবো।

টাইমলাইন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

পদত্যাগ করলেন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী

পদত্যাগ করলেন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী

রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে আইনের বাইরে যাবে না বিএনপি

নিলুফার মনি রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে আইনের বাইরে যাবে না বিএনপি

পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারের দাবি ইনকিলাব মঞ্চের

পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারের দাবি ইনকিলাব মঞ্চের

২০২৭ সালে ৩১ কোটি মানসম্পন্ন বই বিতরণ করা হবে

শিক্ষামন্ত্রী ২০২৭ সালে ৩১ কোটি মানসম্পন্ন বই বিতরণ করা হবে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App