আনার হত্যাকাণ্ড
সেই রাতে শিলাস্তি নয়, অন্য তরুণীর সঙ্গে 'রাত কাটান' শাহীন

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৪, ০৫:২৮ পিএম

ছবি : সংগৃহীত
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীনের ঘনিষ্ঠ সাতজন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। রাজধানীর গুলশানে আনারের ফ্ল্যাটে তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তারা ওই ফ্ল্যাটে একাধিকবার বৈঠক করেছে বলে ধারণা ডিবির। শাহীনের গুলশানের বাসায় নিরাপত্তা প্রহরীদের কাছে থাকা নিবন্ধন খাতা সূত্রে তাদের নাম ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছে ডিবি। যে কোনো সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের ডাকা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কলকাতায় আনার হত্যার সব পরিকল্পনা সম্পন্ন করে মাস্টারমাইন্ড শাহীন ১০ মে বাংলাদেশে চলে আসেন। গুলশান দুই নম্বরের ৬৫ নম্বর রোডের ১৭ নম্বর হাউজের দ্বিতীয় তলার বি-১ ফ্ল্যাটে ওঠেন তিনি। আনার নিখোঁজের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করেন। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। দেশ ছাড়ার আগে গত ২০ মে রাতে গুলশানের বাসা ছেড়ে বান্ধবী চেলসি চেরী ওরফে আরিয়াকে নিয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে রাত কাটান। শাহীনের গুলশানের বাসা ছাড়ার একটি ভিডিও ফুটেজে সে তথ্য পাওয়া গেছে।
সেখানে দেখা গেছে, ২০ মে রাত ১টা ২৫ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের দিকে গুলশানের ফ্ল্যাটের ফটকের সামনে পায়চারি করছেন শাহীন। এ সময় তাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। প্রায় এক মিনিট পায়চারি করার পর ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখা যায় শাহীনের বান্ধবী আরিয়াকে। তার সঙ্গে ছিল বাসার কাজের ছেলেও। এ সময় আরিয়ার হাতে ট্রলি ও ভ্যানেটি ব্যাগ দেখা গেছে।
ডিবি সূত্র বলছে, তারা ওই রাতে একটি হোটেলে থাকে। পরদিন ভারত-নেপাল ও দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায় শাহীন। আর বান্ধবী আরিয়া চলে যান তার বাসায়। রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা এই আরিয়া এর আগে শাহীনের সঙ্গে ভারতেও গিয়েছিলেন। আদালতের মাধ্যমে আরিয়ার ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখার অনুমতি পেয়েছে ডিবি। আরিয়াকে এর আগে ডিবি জিজ্ঞাসাবাদও করেছে।
আরো পড়ুন : রিমান্ড নামঞ্জুর, আলামত উদ্ধারে গ্যাস বাবুকে নিয়ে অভিযানের আদেশ
আনার হত্যা মামলার তদন্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। এ মামলায় কোনো ধরনের চাপ নেই এবং অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
রবিবার (২৩ জুন) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এ মামলায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না এবং কাউকে অযথা ডাকাডাকি করা হবে না। সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা যাকে প্রয়োজন মনে করবে তাকে আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হারুন বলেন, আমরা মনে করি গ্যাস বাবুর মোবাইলে অনেক ডিজিটাল এভিডেন্স আছে। ইতোমধ্যে আমরা অপর পক্ষের মোবাইলের ডিজিটাল এভিডেন্স পেয়েছি। গ্যাস বাবুর মোবাইলে আরো কোনো ডিজিটাল এভিডেন্স আছে কি না তা জানতে মোবাইল উদ্ধারে অভিযান চালানো হবে।
এমপি আনার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর রিমান্ড শেষ হওয়ার আগে তাকে কারাগারে পাঠানোর পেছনে কোনো চাপ ছিল কি না জানতে চাইলে ডিএমপির ডিবি প্রধান বলেন, এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করে তখন তার সেটিসফেকশনের ওপর নির্ভর করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি মনে করে রিমান্ডে তার যা যা জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার সেটা জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেছে, সে ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে আসামিকে জেলহাজতে পাঠাতে পারেন। তবে আবার যদি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা মনে করেন ওই আসামিকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন তখন তিনি জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পেতে পারেন।
তিনি বলেন, ডিবির চৌকশ টিম তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বের করেছে। বাংলাদেশের একজন সংসদ-সদস্য কলকাতার মাটিতে খুন হয়েছেন। সেই হত্যাকাণ্ডের ক্লু বের করতে ডিবি পুলিশের টিম রাত-দিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের টিম নেপালে গিয়েছে এবং আমাদের তথ্যের ভিত্তিতে নেপালে সিয়াম গ্রেপ্তার হয়েছে। এছাড়া কলকাতায় গিয়েও আমরা বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছি আলামত উদ্ধারে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কিলার শিমুল ভুঁইয়াসহ আরো অনেককে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। এর মধ্যে চারজন আসামি বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
আমরা যদি চাপ অনুভব করতাম তাহলে আমাদের এত অ্যাচিভমেন্ট হতো না এই মামলায়। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন কোনো চাপ নেই এই মামলার তদন্তকাজে। আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করা। ডিবির চৌকশ টিম নিরপেক্ষভাবে এ মামলার তদন্তকাজ করছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা রাতদিন পরিশ্রম করছে। আরো যে আসামি আছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।
মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি না জানতে চাইলে হারুন অর রশীদ বলেন, মামলার তদন্তকাজ অনেকটা চূড়ান্ত পর্যায়ে, আমরা অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। কিছু কিছু নাম আমরা পেয়েছি তাদেরও গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছি। এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড শাহীন যুক্তরাষ্ট্রে আছে।
যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের একটা বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে সেহেতু আমরা ভারতীয় পুলিশকে বলেছি যেন তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে আমরা টিম নিয়ে গিয়ে কথা বলেছি। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার মাধ্যমে আমরা ইন্টারপোলে চিঠি দিয়েছি তার বিষয়ে। শাহীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা সবাই কাজ করছি। আরো এক-দুজন আসামি বাকি রয়েছে তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। আশা করছি অতি দ্রুতই মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে যেতে পারব।