আলজাজিরার প্রতিবেদন
ভারতীয় ভিসা নিষেধাজ্ঞায় বিপাকে বাংলাদেশি রোগীরা

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:০৭ পিএম

থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশের চিকিৎসার ব্যয় বেশি হওয়ায় তা তাদের সাধ্যের বাইরে। ছবি : সংগৃহীত
৩৭ বছর বয়সি মোহাম্মদ নুরি আলম লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, তার জরুরিভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন। কিন্তু এটি এমন একটি পদ্ধতি যা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এরপরই তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন সিদ্ধান্ত নেন, হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ভারতের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে যাওয়ার। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো ভিসা পাননি। আর এতে আকাশ ভেঙে পড়েছে খাদিজার মাথায়।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশে ভিসা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
যার ফলে খাদিজা এবং তার স্বামী এরইমধ্যে ২০ নভেম্বর ও ২০ ডিসেম্বর দুটি হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করেছেন। আর আগামী ১০ জানুয়ারি তাদের পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে। কিন্তু হায়দ্রাবাদে চিকিৎসার জন্য তারা ঠিকমত ভারতে যেতে পারবেন কিনা তা অনিশ্চিত।
খাদিজা বলেন, আমরা অক্টোবর থেকে সবকিছু চেষ্টা করেছি- ট্রাভেল এজেন্সিগুলির কাছে যাওয়া, সরকারি মিত্রদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া। ভারতই আমাদের একমাত্র ভরসা।
থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশের চিকিৎসার ব্যয় বেশি হওয়ায় তা তাদের সাধ্যের বাইরে। খাদিজার এখন আশা, নতুন বছরে তার স্বামীর চিকিৎসার জন্য ভিসা পাওয়া যাবে। দুই সন্তানের জননী খাদিজা বলেন, আমি অসহায় বোধ করছি, সমাধান ছাড়াই হাসপাতালের মধ্যে দৌড়াচ্ছি।
তবে শুধু খাদিজা নন, এরকম অবস্থা হাজার হাজার বাংলাদেশি রোগীর। আর এর কারণে ব্যাপক সংকটের মধ্যে পড়েছেন বাংলাদেশের অনেক রোগী। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ভিসা বিধিনিষেধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা।
ভারতের ভিসা সেন্টারের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, তারা শুধুমাত্র জরুরি মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসার জন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে। আর বর্তমানে জরুরি ও মানবিক প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র সীমিত সংখ্যক ভিসা প্রক্রিয়া করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তার মতে, জুলাইয়ের বিক্ষোভে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বাংলাদেশের পাঁচটি ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে দৈনিক অনলাইন ভিসা স্লট প্রায় ৫০০টি কমেছে। যার ফলে খাদিজার মতো অনেক বাংলাদেশির এখন ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা আরো কম।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশত্যাগ করে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। আর এরপরই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন হাসিনা। গত মাসে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকার গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিকে তার প্রত্যর্পণের জন্য কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছেন।
এদিকে ভারত সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশি হিন্দুদের ওপর হামলার কারণে উদ্বিগ্ন। তবে ঢাকার দাবি, ধর্মীয় কারণে নয়, বেশিরভাগ হামলা রাজনৈতিক কারণে হাসিনার কথিত সমর্থকদের ওপরে হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগও রয়েছে, ভারতীয় মিডিয়াগুলো হিন্দুদের ওপর সহিংসতাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে।
আরো পড়ুন : হঠাৎ ভারত সফরে আসছেন বিদায়ী মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা
আর দুদেশের সরকারের মধ্যকার টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে ভিসার ওপর। গত ২৬ আগস্ট ভিসা প্রক্রিয়া বিলম্বের কারণে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে বিক্ষোভ হয়।
এদিকে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে, ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনে হামলা হয়; আর এর প্রতিবাদে ঢাকাতেও তীব্র প্রতিবাদ করেন বাংলাদেশিরা।
১লা জানুয়ারি ঢাকার ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রের সাধারণত ব্যস্ত প্রাঙ্গণ প্রায় জনশূন্য দেখা যায়। মাত্র কয়েকজন আবেদনকারী তাদের নথি জমা দেয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যাদের বেশির ভাগ আবেদনকারী কয়েকদিন আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে ম্যানুয়ালি একটি কপি সরবরাহ করার পর ভিসা কেন্দ্রে তাদের ভিসার আবেদনপত্র এবং ফি জমা দেয়ার জন্য কল পেয়েছিলেন। তবে এক মাস আগে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও ভিসা পাননি খাদিজা।
ভিসা কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেছেন, হাই কমিশন আরো জরুরি আবেদন গ্রহণ করা শুরু করেছে। যদিও অনলাইন জমা দেয়ার বিকল্পগুলো উপায় সীমিত রাখা হয়েছে।
বেশ কিছু বাংলাদেশি দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার কারণে ভিসা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার জন্য ভারতে ভ্রমণ করেননি। তারা এখন মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নিয়ে আটকে আছেন।
জয়পুরহাটের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, আমার এবং আমার স্ত্রীর ভিসার মেয়াদ ছিল ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত ইস্যুতে উত্তেজনার কারণে আমরা তখন ভ্রমণ করিনি।
শরিফুল ইসলাম ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত। তিনি এবং পরিবারের অন্য পাঁচজন সদস্য – প্রত্যেকেরই তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। তার স্ত্রী এবং বাবা গত চার বছর ধরে কলকাতার এবং ভেলোরের হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসার করাচ্ছেন।
জয়পুরহাটের রিদোয়ান হোসেন নামে এক ব্যক্তি একটি ভিসা সাপোর্ট এজেন্সি চালান। ভারতে চিকিৎসার জন্য একজন ক্যান্সার রোগীসহ অন্য রোগীদের জন্য ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের চেষ্টা করছেন তিনি। বারবার অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করেও অর্থপ্রদানের পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন।
এ অবস্থায় অনেক বাংলাদেশি রোগী থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তুরস্কে চিকিৎসার বিকল্প খুঁজছেন। তবে, ভারতের তুলানায় ওসব দেশে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খাদিজার মতো রোগীর। বেশিরভাগ বাংলাদেশিদের জন্য এত খরচ অসাধ্য।