এক সপ্তাহে দেশে ২৩ খুন, বাড়াচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
ছবি: এআই নির্মিত
কোথাও চুরির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, কোথাও জমি নিয়ে বিরোধ, আবার কোথাও ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ঝরছে প্রাণ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘবদ্ধ পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক যুবক। নারী, শিশু, সাংবাদিক, কৃষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ—কেউই বাদ যাচ্ছেন না হত্যার শিকার হওয়া থেকে। ১০ থেকে ১৬ অক্টোবর, মাত্র এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিনের এসব মৃত্যু প্রশ্ন তুলছে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?
একটির পর একটি হত্যাকাণ্ডে জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। প্রশ্ন উঠছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে? অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় মাছ চুরির সন্দেহে ক্ষিতিশ মণ্ডল (৫৩) নামে এক মৎস্যজীবীকে গাছে বেঁধে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ঘেরমালিক বিশ্বনাথ ঘোষ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। একই জেলার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে গত সপ্তাহে। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করে লোকজন জড়ো করা হয়েছিল।
কুমিল্লায় গতকাল শুক্রবার যুবদল নেতা মোহাম্মদ কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগের রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বললেন, সন্দেহের বশে পিটিয়ে হত্যা, গণপিটুনি ও ব্যক্তিগত বিরোধে প্রাণহানি আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে। অপরাধ দমনে শুধু গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং অপরাধের নেপথ্যের কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ, গোয়েন্দা নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, অপরাধীর বিচার আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে; আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বললেন, অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫১ জন গুলিতে, ১৮ জন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবং ২৫ জন অন্যান্য ঘটনায় প্রাণ হারান। একই সময়ে মব-সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৭১ জন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে দেখা যায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর— এই তিন মাসে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন নিহত ও ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। মব-সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫৪ জনের।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বললেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গত ১৪ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা এবং বিট পুলিশিং কার্যকর করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
এক সপ্তাহের আলোচিত হত্যাকাণ্ড
গত ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন ঢাকার কেরানীগঞ্জে চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় ফলবরু (৮০) নামে এক বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। আগের দিন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় ইমদাদুল হক নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বগুড়ার সোনাতলায় ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় ছয় বছরের এক শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।
১৫ অক্টোবর নেত্রকোনার নয়াপাড়ার বুদিয়ার জঙ্গল থেকে হাত বাঁধা ও মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো অবস্থায় অটোচালক রুকন উদ্দিনের (৪০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
১২ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে জর্ডানপ্রবাসী শিরীন বেগমের (৪২) খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, তার স্বামী দুলাল হাওলাদার (৫০) তাকে হত্যার পর মরদেহ চার টুকরা করেন। একই দিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন সাহেব আলী। রূপগঞ্জে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান চালক রাজন (২৫)।
১১ অক্টোবর সিলেটের গোয়াইনঘাটে ব্যবসায়ী বদরুল আলমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন ফতুল্লায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সিলেট নগরের কাস্টঘর সুইপার কলোনিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হৃদয় কুমার হরিজনকে (৩৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মেহেরপুরে ঘুমন্ত কৃষক হাবেল উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গাজীপুরের শ্রীপুরে অন্তঃসত্ত্বা সীমা রানী দাসকে (৩৫) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। রাজশাহীর পবা উপজেলায় জমি নিয়ে বিরোধে সংঘর্ষে নিহত হন ব্যবসায়ী জিয়ারুল ইসলাম (৪৫)।
১০ অক্টোবর যশোরে গরুচোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন মিজানুর রহমান (৪৫)। সিলেটের কানাইঘাটে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তিন বছরের শিশু হালিমা আক্তারকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে।
৯ অক্টোবর বগুড়ার সদর উপজেলার চণ্ডিহারায় চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ইটভাটা শ্রমিক রিপন সরেনকে (৪৫)। ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ।
এ ছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজির বিরোধে এক কাঁচামাল ব্যবসায়ীকে গুলি ও তার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করা হয়। নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলামকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, পরে ধাওয়া করে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পালিয়ে যায়।
এক সপ্তাহের এসব ঘটনা আবারও সামনে এনেছে একটি জরুরি প্রশ্ন— সন্দেহ বা বিরোধের জেরে মানুষকে হত্যা করার প্রবণতা কীভাবে থামানো যাবে? অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপিটুনি প্রতিরোধ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
