৪৪.৭% মানুষ মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার 'আগের সরকারের তুলনায় খারাপ করছে'
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভয়েস অফ আমেরিকার এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ মনে করেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে খারাপ পারফর্ম করছে অথবা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৪.৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, চাল, মাছ, সবজি, ডিম, মাংস, তেল-এর মত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে বর্তমান সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে খারাপ কাজ করছে। অন্যদিকে, ২৩.৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন বর্তমান সরকার আগের সরকারের তুলনায় ভাল করছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩০.৮%) উত্তরদাতা মনে করেন, পরিস্থিতি আগে যা ছিল তা এখনো একই রকম রয়েছে।
জরিপের মধ্যে ১,০০০ উত্তরদাতা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের সাথে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের তুলনা করেছেন। এর মধ্যে নারীদের মধ্যে ৪১.২ শতাংশ মনে করেন পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, যেখানে পুরুষদের মধ্যে ২০.৩ শতাংশ এই মতামত দিয়েছেন। অন্যদিকে, পুরুষদের ৩১.৩ শতাংশ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার আগের সরকারের তুলনায় ভাল করছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে মাত্র ১৬.৩ শতাংশ এই মতামত পোষণ করেছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া জনগণের মধ্যে সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ ছিলেন, এবং ৯২.৭ শতাংশ উত্তরদাতা মুসলিম। উত্তরদাতাদের অর্ধেকের কিছু বেশি বয়স ৩৪ বছরের নিচে এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ শহুরে এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
ভয়ানক আর্থিক চাপ
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা হীরেন পণ্ডিত, যিনি এক বেসরকারি সংস্থায় প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর হিসেবে কাজ করেন, জানিয়েছেন যে ২০২৪ সাল তাঁর জীবনে ভয়ানক আর্থিক চাপ নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, “দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে আমরা দম বন্ধ করার মত অবস্থায় আছি। বাসা ভাড়া বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, যে জিনিস আগে ১৪০ টাকায় কেনা যেত সেটা এখন ১৭০ টাকায় কিনতে হয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৭২ শতাংশ, যা অক্টোবর মাসে ১০.৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তা ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানী বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
সরকারের পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন চাল, আলু, চিনি, তেল, পিঁয়াজ ইত্যাদির উপর আমদানি কর কমানো হয়েছে এবং এলসির মার্জিন ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, এই উদ্যোগগুলো পুরনো এবং এতে কোন নতুনত্ব নেই। তিনি মনে করেন, সরকারের পদক্ষেপগুলো মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ চেইনের ব্যবস্থাপনায় কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি।
এছাড়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কৃষি পণ্যের সরবরাহ চেইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কারণ দেশের বাজারে অলিগোপলি বিরাজ করছে, যার ফলে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
চাকুরীজীবীদের ওপর চাপ
মূল্যস্ফীতি চাকুরীজীবীদের উপর ভয়ানক প্রভাব ফেলছে। হীরেন পণ্ডিত বলেন, আগে আমার মাসিক আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ খরচ হতো বাসা ভাড়া এবং খাদ্যদ্রব্যে, এখন সেটা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। যা আয় করছি তা সবই চলে যাচ্ছে, কোন সঞ্চয় হচ্ছে না। তার মতো মধ্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সখের জিনিস ছাড়াও প্রয়োজনীয় জিনিসও বাদ দিয়ে চলতে হচ্ছে।
সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বাজারে সার্বিক সংস্কার না হলে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে কৃষি পণ্যের সরবরাহ চেইন ব্যবস্থা সংস্কার না হলে এই পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
এভাবে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষকে আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে, এবং সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে জনগণের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
