‘ঋণের ফাঁদে’ দেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা এবং দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝায় চাপে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ সামাল দিতে গিয়ে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের আশঙ্কা, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানো হলে বিদ্যমান সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেশি-বিদেশি সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। ঋণের পরিমাণ ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে মাথাপিছু ঋণের হিসাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের পরিচালন ব্যয় আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত না হলে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট, সরকারের আয় কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাঁর মতে, আগের সরকারের আমল থেকে অর্থনীতির এই অধোগতি শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকারও রাজস্ব আয় বাড়াতে পারছে না, অথচ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁর বিবেচনায় দেশ ইতোমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
আবু আহমেদ আরও বলেন, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিতভাবে বাড়ছে না, অথচ মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের ঋণ পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যার ফলেই ঋণের বোঝা বেড়েছে। অতীতে নেওয়া ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না করে দুর্নীতি ও অপচয়ের মাধ্যমে নষ্ট করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ড. মুজেরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রথমেই সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে উৎপাদনশীল খাতের বাইরে ব্যয় মেটাতে নতুন ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করা জরুরি। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতির ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানো, রাজস্ব আহরণ জোরদার করা এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
