×

ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে চলছে বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণরা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

ইউরোপজুড়ে চলছে বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণরা

ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপের কয়েকটি দেশে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব ও দুর্নীতির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট ও সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষ। কোথাও আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোথাও তা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।

দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ আলাদা হলেও সাশ্রয়ী আবাসন, উন্নত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি প্রায় সব আন্দোলনেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘ সময় ক্লাস, শিক্ষকের সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্পষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক পদে শূন্যতা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক মাস পর্যন্ত নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। শিক্ষাব্যবস্থার এসব সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে পরে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বৃদ্ধি এবং মজুরি বাড়ানোর দাবি তুলেছে।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায়ে ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে ২০২৭ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।

স্পেনে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও উচ্ছেদের প্রতিবাদ

স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নামেন অধিকারকর্মীরা। ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান তিনি।

বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের আবাসন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় জরুরি আবাসন আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থি ও উগ্রডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতায় প্রস্তাবটি পাস হয়নি।

আবাসন সংকট মোকাবিলায় সংস্কার কার্যকর করতে পার্লামেন্টে আরও বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সানচেজ। নির্বাচনের আগে আবাসনসংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব পাস করানো গেলে বিক্ষোভের চাপ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—উভয় পক্ষই আবাসন সংকট সমাধানে আরও বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ

স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগালেও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় জড়ো হন শত শত মানুষ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাড়ির দাম ও ভাড়া সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় আবাসন সংকট দেশটির অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসন নিশ্চিত করা এবং বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বৃদ্ধির লাগাম টানা।

ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ

ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবারের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে তা সহিংসতায় রূপ নেয়।

মুখোশ পরা কিছু বিক্ষোভকারী দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর ও ফুটপাতের ব্লকসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শনিবারই বিক্ষোভ শুরু হয়। এদিকে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ

আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা।

গত গ্রীষ্মে দেশটির উপকূলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিক্ষোভের চাপে কী পরিবর্তন এসেছে?

ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরও তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছিল ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর।

তবে এসব পদক্ষেপের পরও বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থি বিক্ষোভকারী ও লুটপাটকারীদের দায়ী করেছেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সরকার এ পর্যায়ে আরও ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।

ফ্রান্সে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দাবির বিষয়ে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর।

স্পেনেও আবাসনসংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে বিক্ষোভের চাপ কমতে পারে। তবে বাড়িভাড়া, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ কত দ্রুত কমবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তরুণদের দাবিতে মিল কোথায়?

ইউরোপের দেশগুলোতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে স্থানীয় সমস্যা ভিন্ন হলেও মূল দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তরুণেরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি জানাচ্ছেন।

এসব আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয় তরুণদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করছে। সরকারগুলো কিছু পদক্ষেপ নিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না এলে এই ক্ষোভ প্রশমিত করা কঠিন হতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইউরোপজুড়ে চলছে বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণরা

ইউরোপজুড়ে চলছে বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণরা

বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার করলে কী শাস্তি হতে পারে?

বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার করলে কী শাস্তি হতে পারে?

ফায়ার সার্ভিসের ১৩ জরুরি নির্দেশনা

ফায়ার সার্ভিসের ১৩ জরুরি নির্দেশনা

কানাডার সামরিক ঘাঁটিতে আগুন, ৪ সেনা নিহত

কানাডার সামরিক ঘাঁটিতে আগুন, ৪ সেনা নিহত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App