রোগী হিসেবে প্রবেশ করলেও, ফেরা কঠিন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১১ এএম
ছবি : এআই জেনারেটেড
দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার আশায় আসেন হাজারো রোগী। কিন্তু চিকিৎসা শেষে রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়াই অনেক স্বজনের জন্য হয়ে উঠছে বড় ভোগান্তি। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালকেন্দ্রিক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। অ্যাম্বুলেন্সের মালিক, চালক ও স্থানীয় চাঁদাবাজদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই চক্রের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে রোগী পরিবহন করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে একধরনের অলিখিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। দূরত্ব কম হলেও অ্যাম্বুলেন্সে উঠলেই গুনতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থও আদায় করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে কয়েক মাস আগে একটি বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ‘অল সমাধান’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়। এর মাধ্যমে ন্যায্য ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার কথা। তবে সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে অ্যাপটির কার্যক্রমও প্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভাড়ার নামে বাড়তি খরচ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে লালবাগের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া চাওয়া হয় তিন হাজার টাকা। এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট বাবদ ২৮০ টাকা, হুইলচেয়ারের জন্য ১০০ টাকা, সহায়তাকারী কর্মীর জন্য ৫০০ টাকা এবং বকশিশ হিসেবে আরও ১০০ টাকা যোগ হয়। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার টাকা। অথচ একই দূরত্বে উবারের প্রিমিয়ার সার্ভিসে যাতায়াতের খরচ সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত এক মাসে ঢাকা মেডিকেল থেকে রোগী পরিবহনের বেশ কয়েকটি ভাড়ার রসিদ এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১ অক্টোবর হাসপাতাল থেকে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে যেতে ভাড়া নেওয়া হয় আড়াই হাজার টাকা। ২ অক্টোবর পল্লবী-১২ নম্বর এলাকায় যেতে ভাড়া নেওয়া হয় দুই হাজার ৮০০ টাকা। একই দিনে শ্যামলী পর্যন্ত আরেকটি যাত্রায় ভাড়া নেওয়া হয় দুই হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেও এক হাজার টাকা ভাড়া নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকার বাইরে রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়ার অঙ্ক আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন রসিদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১৬ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে যেতে এক রোগীর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়া হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর গলাচিপায় যাওয়ার জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ১৬ হাজার ৫৬০ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট বাবদ আরও দেড় হাজার টাকা যোগ করা হয়। একই দিনে কুষ্টিয়ায় রোগী পরিবহনের জন্য আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা।
রোগী সেজে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, গুনতে হলো ২৭০০ টাকা
গত ১১ অক্টোবর প্রতিবেদক নিজেই রোগী সেজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে যান। ‘সমাধান’ অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স বুক করা হয়। গন্তব্য ছিল যমুনা ফিউচার পার্কের কাছাকাছি, যা হাসপাতাল থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে। অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া চাওয়া হয় আড়াই হাজার টাকা। এর সঙ্গে হুইলচেয়ার ও বকশিশ বাবদ আরও ২০০ টাকা যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে ভাড়া চূড়ান্ত হয় দুই হাজার ৭০০ টাকা।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রা শুরু হয়। চালক সোহেল জানান, তিনি ২০১৪ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেল এলাকায় কাজ করছেন। শুরুতে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালাল হিসেবে কাজ করতেন। পরে অ্যাম্বুলেন্স পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন, এরপর চালকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি নিজেই অ্যাম্বুলেন্স চালান।
প্রাথমিক চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তাঁর এমন কোনো প্রশিক্ষণ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নার্সদের কাছ থেকে অক্সিজেন মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি শিখেছেন বলে জানান তিনি।
সোহেলের ভাষ্য, যাত্রা থেকে পাওয়া ভাড়ার পুরো অর্থই অ্যাম্বুলেন্সের মালিকের কাছে জমা দিতে হয়। প্রতি ট্রিপের জন্য মজুরি হিসেবে তিনি পান ৫০০ টাকা।
নীতিমালায় ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা-২০২৩-এর খসড়ায় বাণিজ্যিক অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা এবং মহানগরীর বাইরে ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া হবে ৬০ টাকা।
এ ছাড়া ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্সে মিটার স্থাপন এবং যাত্রার সময়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। চালক ও সহকারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ধারণা থাকার বিষয়টিও খসড়া নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
ঢাকা মেডিকেলকেন্দ্রিক ১৩৬টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা হাসপাতাল থেকে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। আবার বেসরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগীদের ঢাকা মেডিকেলে আনার ব্যবস্থা করেন। ফলে রোগীর যাতায়াতের দুই দিকেই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রের দাবি, ঢাকা মেডিকেলকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবরের নাম জড়িত। অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় বাদল মাতবরের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ব্যবসায়িক মতবিরোধের কারণে সম্প্রতি আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আজিম ও সাধারণ সম্পাদক শিপন মিয়াসহ আরও কয়েকজন কর্মচারী অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের ভেতরেই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা
ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের গেটের বিপরীতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড রয়েছে। নতুন ভবনের সিঁড়িঘরের একটি অংশেও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্থান থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সিরিয়াল দেওয়া, চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরদাম এবং গাড়ি ঠিক করার কাজ করা হয়।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ফ্লোরে অন্তত দুই ডজন চালক ও সহযোগীকে রোগীর খোঁজে তৎপর থাকতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলের কয়েকজন চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বিপরীতে সমিতির কার্যালয় উদ্বোধন করেন তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান। সে সময় বর্তমান উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমও উপস্থিত ছিলেন। সরকারি জায়গায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সমিতির কার্যালয় স্থাপন নিয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে বলে তাঁরা জানান।
সাবেক পরিচালক বদলি হয়ে নিজ বাহিনীতে ফিরে যাওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমের বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কী বলছেন সমিতির নেতারা?
অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিপন মিয়া বলেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ‘সমাধান’ অ্যাপের মালিকানা বা পরিচালনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিচালকের নির্দেশে অ্যাপটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে এবং হাসপাতালের ভেতর থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দুই মাস আগে লিখিতভাবে সমিতি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাই সমিতির বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই।
অন্যদিকে সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর দাবি করেন, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া থেকে সমিতি কোনো অর্থ আদায় করে না। চালকেরা ভাড়ার ২০ শতাংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পান বলে জানান তিনি।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংকট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি অচল। বাকি ছয়টির পাঁচটি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি আইসিইউ-সুবিধাসম্পন্ন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় তদবির ছাড়া এসব অ্যাম্বুলেন্সের সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন।
এ ছাড়া সান্ধ্যকালীন সময়ে সরকারি চালক ও সহকারীদের কয়েকজন টাকার বিনিময়ে রাজধানীর আশপাশে রোগী পরিবহন করেন বলেও জানা গেছে।
হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবনিযুক্ত পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন গত ১৩ অক্টোবর বলেন, হাসপাতালের জায়গা সীমিত। প্রতিদিন এখানে হাজারো রোগী ও স্বজন যাতায়াত করেন। ফলে হাসপাতালের ভেতরে এভাবে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার কোনো সুযোগ নেই।
