×

আন্তর্জাতিক

বড় ধরনের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র, যেসব কারণ নেপথ্যে

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

বড় ধরনের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র, যেসব কারণ নেপথ্যে

যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় দুটি ঝুঁকি হয়ে উঠছে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং ঋণসীমা নিয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংঘাত। শক্তিশালী ডলার, গভীর আর্থিক বাজার ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে দেশটি এখনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান, ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং কংগ্রেসে রাজনৈতিক মতবিরোধ ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ঋণের বোঝা কমাতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে। বিশেষ করে ঋণসীমা বাড়ানো নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশটি এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে, যেখানে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব আর্থিক দায় সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে উঠবে।

ঋণ ও বাজেট ঘাটতির ক্রমবর্ধমান চাপ

ফ্রান্সের মতো যুক্তরাষ্ট্রও সরকারি আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা এবং বিপুল ঋণের চাপে রয়েছে। দেশটির বাজেট ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই বড় অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ। সরকারের ব্যয় রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত ঋণ নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আগের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়।

প্রদত্ত তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, বার্ষিক বাজেট ঘাটতি ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের সময়কাল ও হিসাবের সংজ্ঞা যাচাই করা জরুরি। জাতীয় ঋণ, ফেডারেল বাজেট ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের অঙ্ক অর্থবছর ও ঋণের হিসাবভেদে পরিবর্তিত হয়।

ঋণের পরিমাণ একাই কোনো দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মাত্রা নির্ধারণ করে না। ঋণের তুলনায় অর্থনীতির আকার, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা, ঋণের সুদের হার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে সরকারের অন্যান্য খাতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়। স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় বজায় রাখা তখন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সুদ পরিশোধেই বিপুল অর্থ ব্যয়

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগ হলো, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকলে পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন এবং নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়। ফলে বাজেটের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে গেলে সরকারকে অন্য খাতে ব্যয় কমানো, কর বাড়ানো কিংবা আরও ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণের সুদ পরিশোধের অর্থ সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় না। যদিও সরকারি বন্ডের সুদ বিনিয়োগকারীদের আয় হিসেবে অর্থনীতিতে ফিরে আসে, তবু ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয় সরকারের আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ঋণের সুদ ও ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আর্থিক দায়—দুটিই চাপে পড়তে পারে।

ডলার ও প্রযুক্তি খাত কতটা সুরক্ষা দেবে?

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকার অন্যতম কারণ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে মার্কিন ডলার ও দেশটির সরকারি বন্ডের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ নিতে পারে এবং অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলক সুবিধাজনকভাবে অর্থায়ন পায়।

তবে এই সুবিধা সীমাহীন নয়। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বন্ডের সুদহার, আর্থিক বাজার এবং ডলারের ওপর। ডলারের বৈশ্বিক ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় সুবিধা দিলেও, সেটি ঋণের হিসাব বা বাজেট ঘাটতির সমস্যাকে অদৃশ্য করে দেয় না।

অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। প্রযুক্তি অবকাঠামো, চিপ, ডেটা সেন্টার ও সফটওয়্যার খাতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এসব বিনিয়োগের সুফল কতটা বিস্তৃতভাবে অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, প্রত্যাশার তুলনায় কম মুনাফা কিংবা বাজারে বড় ধরনের সংশোধন দেখা দিলে প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অতএব, ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য ও প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিলেও এগুলোকে ঋণসংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যায় না।

ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো আইনগত ঋণসীমা বা ‘ডেট সিলিং’ নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা। দেশটির সরকারকে ঋণ নেওয়ার একটি আইনগত সীমার মধ্যে থাকতে হয়। কংগ্রেস সেই সীমা বাড়াতে বা স্থগিত করতে ব্যর্থ হলে ট্রেজারি বিভাগের পক্ষে সরকারের সব আর্থিক দায় সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: ঋণসীমা বাড়ানো নতুন ব্যয় অনুমোদনের সমার্থক নয়। সাধারণত কংগ্রেসের আগে অনুমোদিত ব্যয় ও অন্যান্য দায় পরিশোধের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ঋণসীমা নিয়ে সমঝোতা আটকে গেলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে অতীতেও ঋণসীমা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক দরকষাকষি হয়েছে। এ ধরনের অচলাবস্থায় সরকারকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থপ্রদানে বিলম্ব কিংবা অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হতে পারে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধসহ কিছু আর্থিক দায় সময়মতো পূরণ না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং সরকারি ঋণের খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে।

ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি এমন একটি সংকট তৈরি করতে পারে, যা অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যের অভাব থেকে নয়; বরং রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার কারণে সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ফ্রান্সের সঙ্গে তুলনা কতটা যুক্তিসংগত?

ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে। তবে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো, মুদ্রাব্যবস্থা ও ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি এক নয়। ফ্রান্স ইউরোজোনের সদস্য হওয়ায় দেশটির মুদ্রানীতি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মুদ্রা ডলার ইস্যু করে এবং বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার সুবিধা ভোগ করে।

এই পার্থক্যের কারণে দুই দেশের ঋণসংকটের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য পরিণতি সরাসরি এক করে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ বড় হলেও দেশটির অর্থনীতির আকার, সরকারি বন্ডের বৈশ্বিক চাহিদা এবং আর্থিক বাজারের গভীরতা তাকে বিশেষ সুবিধা দেয়। তবে ফ্রান্সের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও সরকারি ব্যয় ও রাজস্বের ভারসাম্য নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অসন্তোষ তাই যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ধসের সরাসরি পূর্বাভাস নয়। বরং এটি দেখায়, দীর্ঘদিন ধরে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা চলতে থাকলে উন্নত অর্থনীতিতেও জনঅসন্তোষ, নীতিগত অচলাবস্থা ও আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে দেশটি কীভাবে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণের সুদ ব্যয় সামাল এবং রাজনৈতিক সমঝোতা বজায় রাখে তার ওপর। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে কর বৃদ্ধি বা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হওয়ায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে না।

অন্যদিকে, ঋণসীমা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মার্কিন সরকারি বন্ড বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ঋণবাজার এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও চাপে পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বড় ধরনের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র, যেসব কারণ নেপথ্যে

বড় ধরনের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র, যেসব কারণ নেপথ্যে

ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ভিডিও ভাইরাল, অতঃপর যা বললেন ওসি

ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ভিডিও ভাইরাল, অতঃপর যা বললেন ওসি

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে যা আছে

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: ২ বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ নথিতে যা আছে

সরকার ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে

মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকার ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App