পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে জামায়াতের ১৫ দাবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত ও শিল্পের চলমান সংকট নিরসনে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধের বিষয় নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই ঘটনায় বহু শ্রমিক আহত হয়েছেন। তৌফিক শেখ (২১) নামে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হওয়ার পর রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করে নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। একই সঙ্গে পরিবারটির উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। ফলে নিজেদের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পোশাকশ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তাই শ্রমিকদের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দেবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডেরও তীব্র নিন্দা জানায় তাঁর দল। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এতে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
চলমান শ্রম অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগসহ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল বা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার। তবে প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী না করার পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার বন্ধের আহ্বান জানান।
গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, কেন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, কারা দায়ী এবং কী পরিস্থিতিতে এটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহত ও আহতদের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দিতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ শিল্পের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকা জড়িত। কিন্তু শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কারখানা বন্ধের ঘটনায় শিল্প খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।
এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, কারখানার নিরাপত্তা রক্ষা এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্রমিক ও মালিককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বরং পারস্পরিক আলোচনা, আস্থা, সহমর্মিতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ন্যূনতম মজুরির পাশাপাশি নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেশনিং, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের প্রতি জামায়াতের ১৫ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশিল্পের সংকট নিরসন এবং শ্রমিকদের অধিকার ও শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামী। দাবিগুলো হলো—
১. শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করতে হবে।
২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
৫. শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ বা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার চেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।
১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
১৩. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
১৪. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
