×

খুলনা

৬৬ খুনে আতঙ্কিত গোটা নগরী

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৬ এএম

৬৬ খুনে আতঙ্কিত গোটা নগরী

ছবি : সংগৃহীত

একসময় নিরিবিলি ও শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা। প্রাকৃতিক সম্পদ, সামাজিক বন্ধন ও তুলনামূলক শান্ত পরিবেশের কারণে নগরীটির সুনাম ছিল। তবে এরশাদ শিকদারের অপরাধজগতের উত্থানের সময় কিছুদিন অশান্তি দেখা দিলেও ১৯৯৯ সালে তাঁর গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিন শান্ত ছিল খুলনা। সেই নগরী এখন আবারও খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

গত নয় মাসে খুলনা মহানগরী ও জেলায় ৬৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মহানগরীতেই খুন হয়েছেন ৩৩ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদেরও রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ সুপার। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে জখম করা, সরকারি কর্মকর্তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া, মাদক চোরাচালান ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং নীরব চাঁদাবাজির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব তৎপরতায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, শান্তির শহর খুলনায় মানুষ এখন শান্তিতে নেই। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে সবার মধ্যে ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। মানুষের কথার আগেই গুলি চলছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, সরকারি কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের আরও কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি।

সরকারি কর্মকর্তাকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক

নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারের রিকশাচালক ইসমাইল হোসেন জানান, কয়েক দিন আগে রাত ১টার দিকে নিরালা মোড়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। সারা রাতের উপার্জন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

তিনি বলেন, ৩৬ বছর ধরে রিকশা চালালেও আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি।

সম্প্রতি দুই সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনাও নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বুধবার দুপুরে খুলনা সদর সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমারকে তাঁর কার্যালয় থেকে তিন যুবক জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় লোহাপট্টির কসাই লিটনকে দেখা গেছে। তিনি গ্রেনেড বাবু নামে পরিচিত এক ব্যক্তির দলের প্রভাবশালী সদস্য এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ ঘটনায় সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। রোববার এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই বলতে চাই না। পুলিশ তদন্ত করে দেখুক।’ তিনি থানায় কোনো অভিযোগও করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ সদস্য ও যুবকের ওপর হামলা

সম্প্রতি ডিউটি শেষে ফেরার পথে রূপসা থানার পুলিশ সদস্য শাহ আলম ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তরা তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে এবং তাঁর কাছ থেকে নগদ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরে তাঁকে ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনার পর খুলনার পুলিশ সুপার পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করেন।

অন্যদিকে, শনিবার দুপুরে নগরীর সদর থানার কাশেমনগর এলাকায় আশিকুজ্জামান জনি নামে এক যুবককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি জানতে চাইলে খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, দু-এক দিনের মধ্যে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন।

নয় মাসে ৬৬ হত্যাকাণ্ড

খুলনা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে মহানগরী ও জেলায় মোট ৬৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে খুলনা মহানগরীতে হত্যার ঘটনা ৩৩টি। একই সময়ে হুমকি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়ে নগরীর থানাগুলোতে অভিযোগের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেড় বছরে ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও বেড়েছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে দূরদর্শী ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা ছাড় না পায়। পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা ও অপরাধবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি।

চাঁদাবাজির অভিযোগে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

নগরীর খানজাহান আলী রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আব্দুল হাকিম জানান, গত ২১ সেপ্টেম্বর একটি নম্বর থেকে ফোন করে তাঁকে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে গ্রেনেড বাবুর লোক পরিচয় দিয়ে টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ রাখার হুমকি দেন বলে তাঁর অভিযোগ।

আব্দুল হাকিম বলেন, এ ঘটনায় তিনি থানায় যাননি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ১৫ আগস্ট রাতে আশিক গ্রুপের সদস্য আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডে গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্যদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় জয় ঢালীর মা নাসিমা বেগম মামলা করেন। অভিযোগ রয়েছে, মামলা প্রত্যাহারের জন্য গ্রেনেড বাবু চাপ দেন। মামলা প্রত্যাহার না করায় ছেলের হত্যার প্রায় ৫০ দিন পর জয় ঢালীর বাবা আক্তার ঢালীও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রূপসা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হোসেন বলেন, সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তাঁর ভাষ্য, রূপসা উপজেলা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এবং চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন স্থানীয়রা। পুলিশের কার্যক্রম নিয়েও মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ব্যবসায়ী নেতা সোহাগ দেওয়ান বলেন, চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষকে চাঁদা না দিলে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী

প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা শহর ও আশপাশের এলাকায় একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা বিভাগের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্যরা ‘বি কোম্পানি’ নামে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে। পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সী তরুণদের লক্ষ্য করে তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এসব তরুণকে মাদক সরবরাহের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের পরিবার ও বস্তি এলাকার কিশোর-যুবকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে। দেনা-পাওনা বা মাদকের অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে হুমকি-ধমকি থেকে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটছে বলে পুলিশের হাতে তথ্য রয়েছে।

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলাকে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে রূপসায় ১১টি, তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় চারটি এবং বটিয়াঘাটায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এম শাকিলুজ্জামান বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়েছে, তবে বর্তমানে পরিস্থিতির অবনতি কমছে বলে তাঁদের মূল্যায়ন। তাঁর দাবি, ৯০ শতাংশ হত্যা মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলোও সমাধানের পথে। নিয়মিত আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ সন্ত্রাসীদের অবস্থান বা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দিতে চান না। পাশাপাশি অপরাধীরা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমদ বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে এবং সীমান্ত এলাকা দিয়ে এসব অস্ত্র আসছে। অস্ত্র সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভাঙতে কাজ চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বেশির ভাগ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কয়েকজন দেশের বাইরে থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে শহরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী তৎপরতা খুলনার নাগরিক জীবনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন ফিফা সভাপতি

ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন ফিফা সভাপতি

দুর্গাপূজা উপলক্ষে মুক্তি পাচ্ছে যেসব সিনেমা

দুর্গাপূজা উপলক্ষে মুক্তি পাচ্ছে যেসব সিনেমা

বাংলাদেশি দুই পুলিশ সদস্যকে ধরে নিয়ে গেল বিএসএফ

বাংলাদেশি দুই পুলিশ সদস্যকে ধরে নিয়ে গেল বিএসএফ

৬৬ খুনে আতঙ্কিত গোটা নগরী

৬৬ খুনে আতঙ্কিত গোটা নগরী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App