সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডে এইচআরএসএসের গভীর উদ্বেগ, বিচার দাবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। একই সঙ্গে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, জড়িত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে সংগঠনটি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরও তিনি হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় অপরাধ, মাদক কারবার, চোরাচালান, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর পূর্ববর্তী হামলা ও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
এইচআরএসএস মনে করে, একজন সাংবাদিকের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং পরিণতিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ওপর গুরুতর আঘাত। বিশেষ করে, পূর্ববর্তী হামলার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ বা নিরাপত্তার আবেদন করা হয়ে থাকলে, সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সম্ভাব্য হুমকির তথ্য কর্তৃপক্ষের জানা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
সাংবিধানিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। একইভাবে অনুচ্ছেদ ৩৯(২) নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সাংবাদিকের পেশাগত কাজের কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকলে, তা এসব সাংবিধানিক অধিকারের বাস্তব চর্চার জন্য গুরুতর হুমকি।
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর অনুচ্ছেদ ৩ প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার স্বীকার করে। অনুচ্ছেদ ৮ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে কার্যকর প্রতিকারের অধিকার নিশ্চিত করে এবং অনুচ্ছেদ ১৯ মতামত পোষণ, তথ্য অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রচারের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর রাষ্ট্রপক্ষ। এ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ জীবনের সহজাত অধিকার সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে এবং অনুচ্ছেদ ১৯ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ সাংবাদিকদের ওপর হুমকি, ভয়ভীতি, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের কার্যকর ও সময়োপযোগী তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এইচআরএসএস জোর দিয়ে বলছে, সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা শুধু অপরাধের বিচার নয়; বরং ভবিষ্যতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের পরিবেশ রক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
এইচআরএসএসের দাবিসমূহ
১. সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং হত্যার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য নির্দেশদাতা বা পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে।
২. নিহত সাংবাদিকের পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা এবং প্রযোজ্য আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সহায়তা দিতে হবে।
৩. সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এইচআরএসএস মনে করে, স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার, দুর্নীতি ও অপরাধ উন্মোচন এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করে।
অতএব, এইচআরএসএস সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে—সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
