দেওয়ানগঞ্জে নদীভাঙনে নিঃস্ব বহু পরিবার, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা
বিল্লাল হোসেন মন্ডল, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে একসময় যাদের আবাদি জমি ও বসতভিটা ছিল, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, জিঞ্জিরাম ও দশানী নদীর করাল গ্রাসে আজ তা বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
অনেক পরিবারে জোটে না দুবেলা দুমুঠো খাবার। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। নদীভাঙনকবলিত এলাকার শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার ফলে ওই অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাল্যবিবাহ।
জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৬১৮ হেক্টর, যার মধ্যে কৃষিজমি ১৮ হাজার ৭৪৪ হেক্টর। উত্তরে ডাংধরা থেকে দক্ষিণে দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। একসময় এই অঞ্চল কৃষিতে ছিল সমৃদ্ধ; ছিল গোলাভরা ধান আর গোয়ালভরা গরু। কিন্তু সত্তর দশকের পর থেকে যমুনা, জিঞ্জিরাম ও ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথের পরিবর্তনে শুরু হয় ভাঙন। ফলে নদীপারের মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।
ডাংধরা ও চরআমখাওয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জিঞ্জিরাম ও যমুনা নদীর ভাঙনে খোলাবাড়ি, চিথুলিয়া, মোল্লারচর, এরান্ডাবাড়ি, জিগাবাড়ি, মৌলভীরচর, চুনালীপাড়া, মুন্সিপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়া ও পাটাধোয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীতে তলিয়ে গেছে। জনবসতির জায়গায় আজ কেবল ধুধু বালুচর। এলাকার প্রায় ৫ হাজার মানুষ বসতভিটা ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব।
সানন্দবাড়ী লম্বাপাড়া গ্রামের হারুন অর রশিদ জানান, ভাঙনকবলিত মানুষ দিশেহারা হয়ে যে যার সুবিধামতো আশ্রয় নিয়েছে। জীবিকার খোঁজে অনেকেই ঢাকা বা অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে ভাঙন চললেও নদীভাঙন রোধে কখনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
চর বাহাদুরাবাদ গ্রামের সোনামিয়া জানান, নদীভাঙনে এ পর্যন্ত চারবার তাঁর বসতভিটা ও পাঁচ বিঘা কৃষিজমি বিলীন হয়েছে। তাঁর মতো শত শত পরিবারের একই দশা। চরবাহাদুরাবাদ ওপ্যোল্লা কান্দি,বাহাদুরাবাদ ভাটি পাড়া গ্রাম এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। স্থায়ী বাঁধ তৈরি করা না হলে সানন্দবাড়ীর অস্তিত্বও ভবিষ্যতে থাকবে না বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।
এদিকে হাতিভাঙ্গা ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র ও জিঞ্জিরাম নদী। নদীর তোড়ে বিলীন হয়েছে চরহাতিভাঙ্গা, পোল্যাকান্দি, ফারাজীপাড়া, গুমেরচর, নয়াগ্রাম, মদনেরচর ও মাদারের চরের মতো বহু জনপদ। ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাটটিও আজ নদীতে বিলীন। জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ শুরু হলেও আগের ক্ষতি মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
চরপোল্যাকান্দি গ্রামের আমিনুল ইসলাম জানান, তিনবার বাড়ি ভেঙে ব্রহ্মপুত্রের চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর এলাকায় অন্তত এক হাজার পরিবার এভাবে বসবাস করছে। কিন্তু চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে অসচ্ছল পরিবারগুলোর সন্তানরা ভালো লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্বাংশের মাইছানিরচর, তিলকপুর ও কাউনেরচর এলাকায় প্রতিবছর ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে চিকাজানি ইউনিয়নের চরডাকাতিয়াপাড়ার সাজু মিয়া বলেন, "যমুনার করাল গ্রাসে আমার ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি শেষ। আমরা আর কতদিন এভাবে ভাসব? নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে আমরা স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।"
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জহুরুল হোসেন জানান, যমুনা, জিঞ্জিরাম ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের উদ্যোগে প্রস্তাবিত। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলেই নদীভাঙন রোধের দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হবে।
