×

জাতীয়

এক ছাগলেই ধ্বংস করলো মতিউরের সাজানো বাগান

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৪, ১০:৫১ এএম

এক ছাগলেই ধ্বংস করলো মতিউরের সাজানো বাগান

ছবি : সংগৃহীত

ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা ‘অবৈধ সম্পদ আর প্রতাপ’-এর সাম্রাজ্য ধসে পড়ার সব আয়োজন সম্পন্ন। প্রভাব খাটিয়ে পাহাড়সম সম্পদ আর বিত্ত-বৈভবের যে রাজকীয় জীবনযাপনে ঢুকেছিলেন তিনি, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তা যেন তাসের ঘরের মতো ধসে যাচ্ছে। এক ছাগলেই খেয়ে ফেললো তার সাজানো গুছানো সাম্রাজ্য।

মতিউরকে নিয়ে এখন চারিদিকে সন্দেহ। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা (দুদক) তার সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমে পড়েছে। তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে। সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেও এখন তাকে ডাকা হচ্ছে না। মাত্র এক সপ্তাহেই সব কিছু অপরিচিত হয়ে উঠেছে মতিউরের কাছে। এখন যেন কাছের লোকরাও চিনতে চাইছেন না।

মতিউরের কানাডা প্রবাসী মেয়ে ফারজানা রহমান ইপ্সিতা তার স্বজনের কাছে ভয়েজ মেসেজে বাবার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো চাঞ্চল্যকর ওই ভয়েজ মেসেজের কিছু অংশ এরকম-

‘বিশ্বাস করেন, আমার বাবারে প্রটেক্ট করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। তার ওপর আমার জিদ। আল্লাহর কসম, বাবারে আমি ছারুম না। সে আমারে ধোঁকা দিছে (দিয়েছে), আমার মারে (মাকে) ধোঁকা, আমার ভাইরে ধোঁকা দিছে। আমি তারে ছারুম? জীবনেও না। তার জন্য আমার নাম নষ্ট হবে, মার নাম নষ্ট হবে, এইটা আমি হইতে দিমু না।’

শুধু প্রথম পক্ষের এই মেয়ের ক্ষোভ নয়, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে পাড়ি জমানো দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিভলীও চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন মতিউর। যে মেয়ের সঙ্গে দিনে অন্তত একবার কথা বলতেন, সেই মেডিকেল পড়ুয়া মেয়ে মাধবী বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ভেঙে পড়েছেন।

আর প্রথম স্ত্রী রায়পুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ ও তার সন্তানরা আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের দায়ী করছেন। একই সঙ্গে স্বামীকে ডিভোর্স দিতে দ্বিতীয় স্ত্রীকে চাপ দিচ্ছেন মতিউরের বোন। বিশেষ করে মঙ্গলবার মতিউরের বিভিন্ন ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পর সব ওলটপালট হয়ে গেছে। ভাইয়েরাও চলে গেছেন আত্মগোপনে। বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীরাও দূরে সরে আক্ষেপ ও মজার ছলে বলছেন-এক ছাগলে তছনছ হয়ে গেছে মতিউরের সাজানো বাগান। একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ইতোমধ্যে বিশ্বখ্যাত ম্যাকলারেন ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ির ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের প্রথম পক্ষের মেয়ে ফারজানা রহমান ইপ্সিতা। যে বাবার কল্যাণে কানাডায় তার বিলাসী জীবন, সেই বাবাকেই এখন ছেড়ে কথা বলছেন না। স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে চালাচালি হওয়া তার একাধিক ভয়েজ মেসেজের ক্লিপ এসেছে এ প্রতিবেদকের কাছে। এসব মেসেজের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:

আরো পড়ুন : মতিউরের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ছবি ফাঁস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছাগলকাণ্ড ভাইরাল হওয়ার প্রসঙ্গে ইপ্সিতা তার ভয়েজ মেসেজে বলেন, ‘মানুষের দোষ তো নাইরে ভাই। দেশের মানুষ তো আসলেই কষ্ট করে। এই লোকটা আমার মারে এত বড় চিট করল ভাই। আমি এক মিনিট পরপর আমার মার (মায়ের) সঙ্গে কথা বলতাছি (বলছি)। আমার মা হাউমাউ করে কান্দে (কাঁদে)। আমার ভাই কান্দে। আমার ভাই আমারে বলে, বাপ আমাদের কখনো ভালোবাসে নাইরে আপু। ভালোবাসলে সে এইভাবে চিট করত না। এখন কী করব জানি নারে ভাই। আমার আর ভাল্লাগে (ভালো লাগে) না। মানুষের রাগ তো আমি বুঝতে পারছি। বিকজ আপনারা অনেক ভুক্তভোগী। এই...সরকার। আল্লাহ মাফ করুক, আসলেই ভুক্তভোগী। কিন্তু আমার ফ্যামেলি, আমার, আমার মা-ভাইয়ের কোনো দোষ এখানে ছিল না ভাই। তার আছে অনেক। আমি জানি টাকাপয়সাও ইলিগ্যাল না। তার ভালো ফ্যামেলি। বিয়াও করছিল ভালো ফ্যামেলির মাইয়া (মেয়ে)। তাইলে ভালো ফ্যামেলির মাইয়ারে বিয়া (বিয়ে) কইরা (করে) তুই রাখতে পারলি না। তোর এত খারাপ লাগছে, আমার মারে ছাইড়া তুই চইলা যাইতি। তুই আমাদের চিট করলি কেন। তুই তোর চাকরি বাঁচাইতে পারবি, টাকা বাঁচাইতে পারবি। কিন্তু তুই যে আমাদের ধোঁকা দিছোস, এইটা আমরা কী করুম। আমরা কই যামু (যাব), কারে মুখ দেখামু (দেখাব)।’

ভয়েজ মেসেজের আরেকটি ক্লিপে তিনি বলেন, ‘আমার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটা খাইয়া দিছে হ্যাকারে। ইভেন আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবলেম করতাছে। মানুষ আমার পেছনে লাগছে কেন বুঝলাম না। ইভেন আমার পেজে...এগুলো কে করাচ্ছে? আমি কার ক্ষতি করলাম। আমার মার অ্যাকাউন্টে প্রবলেম করতাছে। আমার মা তো একজন উপজেলা চেয়ারম্যান। এখানে না, কেউ একজন মাস্টার গেম আছে, মানে কেউ একজন আমাদের সঙ্গে গেম খেলতাছে। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। আপনি পলিটিক্সে ছিলেন। আপনি বোঝেন না। মনে হইতাছে আমাদের সঙ্গে গেম খেইলা ওই ফ্যামেলি সামনে আসতে চাইতাছে। বেটার তো আসলেই টাকাপয়সা আছে। তার পুরা চৌদ্দ গোষ্ঠী ভালো বিজনেজ কইরা যাইতেছে। তার ভাই ভালো বিজনেজ করে। এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের বিজনেস। তার ছোট ভাইয়ের তিন-চারটা গার্মেন্ট। সব নিজের। তার তো কিছুর অভাব নাই। আমার কেন জানি মনে হয়, সম্পত্তির জন্য ওই সেকেন্ড ফ্যামেলি সামনে আসতে চাইছে। বাপে মনে হয় বলছে না, এখন সে আমাদের অ্যাকিউস কইরা কইরা এই কাহিনিটা করছে। নাইলে কেন করবে। এখন কয় ছাগল সে কিনে নাই। ছাগল বউয়ের জন্য কিনছে, বউ পছন্দ করছিল। অথচ শুরুতে কইছিল বাবা পছন্দ করছে। শুরু কী করছে পোলায়।’ মতিউরের প্রমোশন, সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক ড্রামার অনেক তথ্য ফাঁস হয়েছে ইপ্সিতার ভয়েজ মেসেজে।

জানা যায়, মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজও আত্মগোপনে আছেন। ঈদের পর থেকে তিনি উপজেলা পরিষদের অফিসে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। নেই বসুন্ধরার বাসায়। কোথায় আছেন, তা তার ঘনিষ্ঠজনরাও বলতে পারছেন না। প্রথম পক্ষের ছেলে আহমদ তৌফিকুর রহমানও পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন না। বন্ধুবান্ধব কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। এমনকি লায়লা কানিজ, কাইয়ুমসহ পরিবারের অন্যরা ঈদের দুইদিন পর পর্যন্ত যেসব মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন, সেগুলো এখন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, কৌশল হিসেবে তারা নতুন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছেন।

আরো পড়ুন : উখিয়া দিয়ে চোরাই গরু আনেন সাদিক এগ্রোর ইমরান

পারিবারিক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, মতিউরের সাজানো রাজ্য এমনভাবে তছনছ হয়েছে যে, যাকে নিয়ে এই ছাগলকাণ্ড, সেই ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাত দুই দফা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তার মা শাম্মী আখতার আছেন প্রচণ্ড চাপে। একদিকে ইফাত মানসিক যন্ত্রণার কথা বলে স্ত্রীকে মালয়েশিয়া উড়িয়ে নিতে তাকে চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে মতিউরের বোন তাকে ফোন করে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে হুমকি দিচ্ছেন। ইফাতের আরেক বোন মাধবী ঢাকার একটি এলাকায় এখন ঘরবন্দি। মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হয়েও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে তিনি ক্লাসে যাচ্ছেন না। এছাড়া মতিউরের ভাইয়েরাও আত্মগোপনে আছেন। তার ছোটো ভাই এম কাইয়ুম হাওলাদার টঙ্গীর এসকে ট্রিম অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে কারখানায় যাচ্ছেন না। থাকছেন না বাড়িতেও। আরেক ভাই নূরুল হুদাও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন না। যারা বিভিন্ন সময় মতিউর রহমানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন, সেই শুভাকাঙ্ক্ষীরাও নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছেন। এর মধ্যে অনেক গণমাধ্যমকর্মীও আছেন, যারা তার কাছ থেকে ব্যাপক সুবিধা নিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ এখন উলটো মতিউর পরিবারের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন।

জানা যায়, মতিউর রহমানের ব্যক্তিজীবন রহস্যঘেরা। বাইরে তিনি নিজেকে ধর্মভীরু বলে প্রচার চালালেও অন্দরমহলে তার চলাচল ছিল বেপরোয়া। মতিউর নিজের ফেসবুক ওয়ালে প্রতিদিন হাদিস ও আল কুরআনের বাণী আপ করতেন। অথচ তিনি অসৎপথে বিপুল ধনসম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বসুন্ধরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর কুড়িল বিশ্বরোড পৌঁছেই তিনি গাড়ি পরিবর্তন করতেন। কাকরাইলের এনবিআর অফিসে যেতে তিনি তিনবার পালটাতেন গাড়ি। এমনকি এক গাড়ির চালক আরেক গাড়ির চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন না। কবে কোন গাড়ি তিনি ব্যবহার করবেন, সেটাও চালকদের সবাই জানতেন না। নিজস্ব পরিকল্পনামাফিক চালকদের ফোন করে নির্ধারিত জায়গায় থাকতে বলতেন। কেন তিনি এটা করতেন, তা কেউ বলতে পারেনি। প্রতিদিন তিনি তার নিজের মনোরঞ্জনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতেন বলেও জানা গেছে।

টাইমলাইন: ছাগলকাণ্ডে বিপাকে মতিউর

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘নালার সংস্কারকাজ করিয়ে ২০-৫০ হাজার টাকা নেন নয়নের অনুসারীরা’

‘নালার সংস্কারকাজ করিয়ে ২০-৫০ হাজার টাকা নেন নয়নের অনুসারীরা’

‘ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা আসবে’ বলে মাইকিং, দুইজন গ্রেপ্তার

‘ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা আসবে’ বলে মাইকিং, দুইজন গ্রেপ্তার

‘ব্যক্তি স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না’

‘ব্যক্তি স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না’

তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App