ঢাকা মেডিকেল
ভর্তি ১২৪ জন, খেটে খাওয়া মানুষই বেশি
আজিজুর রহমান জিদনী
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: ভোরের কাগজ
নারায়ণগঞ্জের ঝালকুড়িতে গত ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন অটোচালক সবুজ। কোথা থেকে এসে তার পায়ে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিরাপদ স্থানে পৌঁছে পরিবারকে বিষয়টি জানান। তখন তার স্বজনরা প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ও পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাঁটুর ওপরে গুলি ভেদ করে হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের মেইল ওয়ার্ডের ১৬ নাম্বার বিছানায় এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। গতকাল রবিবার হাসপাতালে ভুক্তভোগীর বন্ধু আটোচালক রানার সঙ্গে কথা হলে এসব কথা জানান তিনি।
শুধু সবুজই নয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সহিংসতায় গুরুতর আহত হয়ে শতাধিক রোগী এখনো ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সহিংসতার ঘটনাটি ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটলেও চিকিৎসাধীন অধিকাংশই খেটে-খাওয়া মানুষ। এদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। ঢামেক হাসপাতাল সূত্র বলছে, কোটা সহিংসতায় আহত হয়ে গতকাল রবিবার পর্যন্ত হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে ১২৪ জন ভর্তি আছেন। এর মধ্যে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন ১৫ জন।
এ প্রতিবেদকের কথা হয় কোটা সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন সিএনজি চালক দেলোয়ারের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ‘১৮ জুলাই সারা রাত সিএনজি চালাই। পরের দিন সকালে রাজধানীর ওয়াপদা রোডের পাওয়ার হাউজের গ্যারাজে সিএনজি জমা দিয়া নাস্তা খাই। পরে শুনতাছি গ্যাঞ্জাম। তাই বাসার দিকে যাইতাছিলাম। হাতিরঝিলে যাওয়ার নতুন রাস্তার মুখে আইলেই কোথা থেকে পায়ে গুলি লাগে। গুলি ডান পায়ে ঢুকে রানের হাড্ডি ফেটে গেছে।’
দেলোয়ারের স্ত্রী লাইজু এ সময় বলেন, আমরা ছাত্র-কোটা বা অন্য নীতি বুঝি না। আমাগো নীতি পেট নীতি। মানুষডা এখন গুলি খাইয়া পইড়া রইছে। ৩ ছেলেমেয়ে আমার। আমাগো দেখে কে? গত ২০ জুলাই বাড্ডা শাহজাদপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংসতা চালাকালীন গুলিবিদ্ধ হন পেশায় ইলেট্রিক মিস্ত্রি আলিমুল ইসলাম। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। গতকাল ভোরের কাগজের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বাড্ডা শাহজাদপুর কনফিডেন্স টাওয়ারে বিপরীত পাশে একটু অদূরেই থাকেন তিনি। গত ২০ জুলাই কোথা থেকে এসে তার পায়ে গুলি লাগে। বাম পা ভেদ করে তার গুলি বের হয়ে যায়।
গতকাল ঢামেক বার্ন ইউনিটের ৪ তলার ৫০৩ নাম্বার ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, কোটা সহিংসতা চলাকালীন গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৩ জন ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে একজন ছাত্র পাওয়া যায়। তার নাম সিয়াম। কামরাঙ্গী চড়ের বাসিন্দা সে, স্থানীয় হাজি আবদুল আওয়াল ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ২য় বর্ষের ছাত্র। তার মা সানজিদা বেগম ভোরের কাগজকে জানান, ১৯ জুলাই তার ছেলে কামরাঙ্গীচর থেকে নিউমার্কেটে আসে। রাতে তারা খবর পান ছেলে বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে ছেলেকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। শুধু এই ওয়ার্ডেই নয়; ঢামেক হাসপাতালের চোখ-কান-নাক-গলা (ইএনটি) বিভাগেও চিকিৎসা নিয়েছেন অনেকে।
ইএনটি বিভাগ সূত্র জানায়, চোখে গুলির আঘাতে আহত ৩ নারীসহ প্রায় শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে থেকে ৩৮ জনকে ভর্তি নেয়া হয়েছে। ২২ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনজন দুই চোখে ঘোলা দেখলেও তাদের চোখ পরিপূর্ণ ঠিক হবে কিনা- সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। তারা তিনজন হলেন- যাত্রাবাড়ীর আসিফ, শনির আখড়ার মবিন ও উত্তরার সুমন। তাছাড়া ৭-৮ গুলির আঘাতের কারণে একজনের চোখ নষ্টের পথে।
ভোরের কাগজের ঢামেক হাসপাতাল প্রতিনিধি হায়দার আলী গতকাল জানান, কোটা সহিংসতার ঘটনায় অনেক আহত ব্যক্তি ঢামেক হাসপাতালে এসেছেন। গত শনিবার পর্যন্ত অন্তত ১৬১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ৩০০ এর বেশি ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য এসেছেন। এর মধ্যে অনেকে চলে গেছেন আবার অনেকে ভর্তি রয়েছেন। চিকিৎসা নিতে আসাদের মধ্যে ছাত্রদের চেয়ে খেটে খাওয়া মানুষ তিনি বেশি দেখেছেন বলে জানান।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, আজ (গতকাল) পর্যন্ত ১২৪ জন ভর্তি রয়েছেন হাসপাতালে। এর মধ্যে আইসিইউতে ১৫ জন রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সবাই বিনা মূল্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। আহতদের জন্য যখন যা করার তার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসাধীন কারা-কারা বা কতজন সাধারণ ছাত্র; সে তথ্য তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি ঢামেক পরিচালক।
