রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কেন? পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:৫২ পিএম
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ। ছবি : ইন্টারনেট
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। এই পদটি গণপ্রজাতন্ত্রের প্রতীকী হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক ও প্রস্তাবনা এসেছে। বর্তমান নির্বাচন সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ইতিহাস ও পরিবর্তন
প্রথম দফার সরাসরি নির্বাচন : বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনকার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ছিলেন কার্যত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
একদলীয় শাসন ও পরিবর্তন (১৯৭৫) : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে, তবে দেশ সামরিক শাসনের কবলে পড়ে। এরপর জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি রেখে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন।
সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন (১৯৯১) : ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ারে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। সেই সময় তিন জোটের সম্মিলিত প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন।
বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। ফলে, এই পদের কার্যক্ষমতা অনেকটাই সীমিত এবং প্রথাগতভাবে প্রতীকী।
যেমন, ১৯৯১ সালে আব্দুর রহমান বিশ্বাস বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ডঃ ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ এবং বর্তমানে মোঃ সাহাবুদ্দিন দলীয় প্রধানের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
আলোচ্য প্রস্তাব: সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক বৈঠকে সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব উঠে এসেছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি সামনে এসেছে:
পক্ষে যুক্তি
১. যোগ্যতা ও দক্ষতা বিবেচনার সুযোগ : দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততা নিশ্চিত করা যাবে।
২. জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত : সরাসরি ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জনগণের নৈতিক সমর্থন পাবেন।
৩. ক্ষমতার ভারসাম্য : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা সম্ভব।
বিপক্ষে যুক্তি
১. সংঘাতের শঙ্কা : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।
২. সংসদীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী : সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদীয় পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৩. পুনরায় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় ফেরার শঙ্কা : দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো সরকারে অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।
বিকল্প প্রস্তাব: ক্ষমতার ভারসাম্য
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন। যেমন :
- প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপর সাংবিধানিক নজরদারি।
- সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের ক্ষমতা।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা কেবল একটি পদ্ধতির পরিবর্তনের কথা নয়, বরং এটি ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শক্তিশালীকরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার চেয়ে বরং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করার দিকে নজর দেয়া সম্ভবত দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে।
