বর্তমান সাইবার আইন সরকারের জন্য আত্মঘাতী: টিআইবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বিতর্কিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হবে। একই সঙ্গে এ আইন সরকারের জন্যও বুমেরাং বা আত্মঘাতী হতে পারে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্ল্যাটফর্মগুলোর মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্যকে বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনাকে সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ যোগসাজশের কারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর আইন চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঘটনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো উল্লেখ করেন। এসব ক্ষেত্রে ফেসবুকের অপব্যবহার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার উপায় বের করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে শফিকুল আলম বলেন, মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় না রেখে দেওয়ানি আইনের অধীনে আনা এবং বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধান করা যেতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সম্মানহানি করলে ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, এতে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম বা মিডিয়া হাউস বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধানও এতে রয়েছে।
শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা পেলে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও আইনে নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গ্রাম ও তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত সংবাদকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
সাইবার কাউন্সিলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি
প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান ও অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু।
তিনি বলেন, অতীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও দায়মুক্তির বিধান ছিল না। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে এ আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা প্রয়োজন।
অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়েও আপত্তি জানান তিনি।
শরীফুজ্জামান পিন্টু বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচজন মন্ত্রী, নয়জন সচিব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হচ্ছে না। নির্বাহী বিভাগকে এভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাউন্সিলে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম একই অবস্থানে রয়েছে। তাই এ দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি।
তিনি প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানান।
