ইশরাককে পদত্যাগ করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে পাঠান। সেখানে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে রোববার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট মহলেও এ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।
দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে কেন তিনি নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের মতে, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভার ওপরও পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি। কোথাও কোথাও পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব পরিদর্শনের দিন বিকেলেই ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা ঘটে। দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ধারণা, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনার বড় অংশ আড়ালে পড়ে যায়।
অস্ত্র হাতে কী করেছিলেন ইশরাক
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে কয়েকজনকে ধরার নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। এ সময় তাঁর পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলতে শোনা যায়।
প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। তাঁদের একজনকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা যায়। ভিডিওতে কয়েকজনকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অনুনয় করতেও শোনা যায়। আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে।
ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
তদন্ত করছে ডিএমপি, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আত্মরক্ষায় অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার দাবি ইশরাকের
সমালোচনার মধ্যে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক প্রতিনিধিদের যৌথ সিদ্ধান্তে কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইশরাকের ভাষ্য, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে ইশরাক বলেন, অভিযানের আগে তিনি জানতে পেরেছিলেন, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
নিজের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত উল্লেখ করে ইশরাক দাবি করেন, আত্মরক্ষার জন্যই তিনি অস্ত্রটি প্রদর্শন করেছিলেন এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানে চার-পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি গণমাধ্যম অভিযানের এসব তথ্য উপেক্ষা করে ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি; পরে পুলিশ ঘটনাটি জানতে পারে। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন তিনি।
এর আগে পদত্যাগ করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম জড়ানোর পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদ ছাড়তে হয়েছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসে। বিষয়টি নিয়ে দল ও সরকারের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে হামলা-ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
মিষ্টির পদত্যাগের প্রায় আড়াই সপ্তাহের মধ্যে এবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এল। উভয় ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করার মতো পরিস্থিতির পর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ইশরাকের পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
