মিষ্টি থেকে ইশরাক: কী বার্তা দিচ্ছেন তারেক রহমান?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
ছবি: এআই নির্মিত
ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা জনপ্রতিনিধি, অভিযোগের মুখে পড়লে পদ-পদবি কাউকেই সুরক্ষা দেবে না, এমন বার্তাই সামনে আসছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায়। এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। দলীয় ক্ষমতা ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি নিশ্চিত করার এই অবস্থান কতটা কঠোর, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
ঘটনা দুটি ভিন্ন হলেও রাজনৈতিক তাৎপর্যে রয়েছে মিল। ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঘিরে আলোচনায় আসেন সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
অন্যদিকে, রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়া নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। দুজনই ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁদের ঘিরে ওঠা অভিযোগের পর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে আসায় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অবস্থান এবং দলীয় নেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়। ঘটনাটির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে আসে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। গত ১ অক্টোবর মিষ্টি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই তার সংসদীয় আসন শূন্য হয়েছে।
মিষ্টির ঘটনার পর এবার আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন ওঠে।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে নামা কতটা বিধিসম্মত, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পুলিশ জানায়, আইনের ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইশরাক নিজের বক্তব্যে দাবি করেন, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তার দাবি, অভিযানে কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ এবং কয়েকজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অর্থাৎ, অভিযানের উদ্দেশ্য ও অস্ত্র প্রদর্শনের যৌক্তিকতা— দুটি পৃথক প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে।
বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন, সেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।
ইশরাকের ঘটনার দিন শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন তিনি। কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়ও বেঁধে দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ পরিদর্শনের দিনই বিকালে ঘটে ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ড। দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের ইতিবাচক আলোচনা অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।
এরপর ১৮ অক্টোবর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে। তবে ওই দিনের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কারও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিষ্টি ও ইশরাকের ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে সরকারের জবাবদিহি নীতি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় কি কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগের ঊর্ধ্বে রাখবে? দ্বিতীয়ত, জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীর আচরণে বিতর্ক তৈরি হলে সরকার কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়? তৃতীয়ত, অভিযোগের তদন্ত এবং পদত্যাগের মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছভাবে এগোয়?
মিষ্টির ঘটনায় রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যের পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে। ইশরাকের ক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও এবং তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের পর পদত্যাগের নির্দেশের খবর এসেছে। দুটি ক্ষেত্রেই সরকারের অবস্থানকে দলীয় শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রশ্নে কঠোর বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং আইনি দায় নির্ধারণ এক বিষয় নয়। পদত্যাগের নির্দেশ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক জবাবদিহির অংশ হতে পারে; কিন্তু কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই হয় যখন অভিযোগ ওঠে নিজেদের দলের নেতা, সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশের ঘটনা তারেক রহমান সরকারের সামনে সেই পরীক্ষারই দুটি উদাহরণ তৈরি করেছে। দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে বার্তা এসব ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তবে কতটা ধারাবাহিক হবে— সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জিরো টলারেন্স শুধু পদত্যাগের নির্দেশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের সমান প্রয়োগ, সরকারি দায়িত্বে শৃঙ্খলা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা— সব ক্ষেত্রেই একই নীতি কার্যকর হতে হবে।
মিষ্টি ও ইশরাকের ঘটনাকে ঘিরে তাই আলোচনার কেন্দ্রে শুধু দুজনের পদত্যাগ নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রশ্ন— ক্ষমতাসীন দলের কেউ বিতর্কে জড়ালেও কি একইভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন?
